ছবি : রূপালী বাংলাদেশ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একসময়ের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার দূরত্ব দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি আসীন হওয়ার পর নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় দল দুটির মধ্যকার এই আদর্শিক ও কৌশলগত দূরত্ব নতুন মোড় নিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এই পারস্পরিক অনাস্থা ও দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে সুকৌশলে রাজনীতির মাঠে নিজেদের হারানো জমি ফিরে পাওয়ার ছক কষছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এই সময়ে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অনৈক্যকে প্রতিপক্ষ শিবির তাদের পুনরুত্থানের সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে।
জামায়াতের নতুন করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা : বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকেরা জামায়াতের সম্প্রতি রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ এবং বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করে আসছেন। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রকাশ্যেই বিভিন্ন জনসভায় অভিযোগ করেছেন, অতীতে গণতন্ত্রের দীর্ঘ লড়াইয়ে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যারা নেপথ্যে ভিন্ন অ্যাজেন্ডা নিয়ে কাজ করেছে, তারা এখন নতুন করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। রিজভীর মতে, জনগণের দীর্ঘ রক্তস্রোতের বিনিময়ে অর্জিত রাজনৈতিক বিজয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং গণতান্ত্রিক ধারাকে বাধাগ্রস্ত করতে একটি বিশেষ চক্র সুপরিকল্পিতভাবে বিএনপি ও অন্যান্য সমমনা দলের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে।
স্থায়ী কমিটির একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যুগপৎ আন্দোলন ও জাতীয় সংকটে নানা দল একসঙ্গে লড়াই করলেও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে কিংবা রাষ্ট্রীয় সংস্কারে নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ও জনমতের প্রতিফলন ঘটানোই মূল অগ্রাধিকার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াত যেভাবে স্বাধীন রাজনীতি ও একক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে বিভাজন তৈরি হচ্ছে। আর এই বিভেদের সেলাই আলগা হলে সেখান থেকে ফায়দা নেবে কেবল পলাতক ফ্যাসিস্ট শক্তি।
দলের স্থায়ী কমিটির আরেকজন সদস্য মনে করেন, অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক অধ্যায় পার হয়ে নির্বাচিত সরকার আসার পর রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দেড় দশকের জঞ্জাল দূর করে রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা যখন প্রধান চ্যালেঞ্জ, তখন নিজেদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি বা দূরত্ব তৈরি করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছু নয়। বিএনপি সব সময় উদার ও সবাইকে নিয়ে চলা রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, তবে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।
বিএনপির ফরিদপুর বিভাগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াতের ক্যাডারভিত্তিক বা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের মেয়াদে যখন একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি, তখন কিছু অতিউৎসাহী তৎপরতা মাঠের পরিবেশকে উত্তপ্ত করছে। জনগণের ভোটাধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় বিএনপি সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যেকোনো ধরনের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে প্রস্তুত রয়েছে। মাঠের রাজনীতিতে ফাটল ধরাতে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন সফল হতে দেওয়া যাবে না।
জামায়াত কাউকে ভয় করে না : জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি ও আত্মপক্ষ সমর্থন বিএনপির এসব কঠোর সমালোচনা ও পর্যবেক্ষণের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও তাদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, 'জামায়াত একটি স্বতন্ত্র, নিবন্ধিত ও সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দল। জনগণের অধিকার আদায় এবং একটি বৈষম্যহীন সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে আমরা আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে কর্মসূচি পরিচালনা করছি। কোনো দলের কৃপা বা আনুকূল্যে আমাদের রাজনীতি চলে না। অতীতে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে আমাদের নেতাকর্মীদের রক্ত ও ত্যাগের ইতিহাস দেশবাসী দেখেছে। বর্তমান সংসদীয় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনকল্যাণমুখী রাজনীতি করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। অন্য কোনো দল বা মহল আমাদের নিয়ে কী ভাবল, তাতে আমাদের মূল রাজনৈতিক অভিযাত্রা ব্যাহত হবে না।'
পুনরুত্থানের সুযোগ খুঁজছে স্বৈরাচারী সরকারের দোসররা : রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার এই শীতল লড়াই ও দূরত্ব আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পাওে; বিশেষ করে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের দোসররা যখন পুনরুত্থানের সুযোগ খুঁজছে, তখন এই দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির দূরত্ব তাদের পথকে সুগম করে দিতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে এবং ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান চিরতরে রোধ করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে ন্যূনতম জাতীয় ঐক্যের জায়গায় অবিচল থাকতে হবে। অন্যথায় ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থ বা আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শেষ পর্যন্ত পুরো জাতিকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বিএনপি নেতাদের প্রতিক্রিয়া : আদর্শিক দূরত্ব ও কৌশলগত অবস্থান বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক গতিবিধি এবং অতীতের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করা হয়। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী প্রকাশ্যেই জামায়াতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন, তারা অতীতেও বিভিন্ন সময়ে সুযোগসন্ধানী ও গোপন রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ঐতিহাসিক একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে জামায়াতের অবস্থান কখনোই জনগণের পক্ষে ছিল না। রিজভীর মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশের যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা নস্যাৎ করতে এবং নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে একটি বিশেষ পক্ষ পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন : রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার এই পারস্পরিক অনাস্থা এবং মতানৈক্য দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে শ্লথ করে দিতে পারে। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে এই দলগুলো যুগপৎ ও পৃথকভাবে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রাক্কালে তাদের মধ্যকার এই দূরত্ব আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসন বা তাদের সমমনা চক্রের চক্রান্তকে সফল করার পথ সহজ করে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মুহূর্তে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে যদি ন্যূনতম ঐক্য বজায় না থাকে, তবে তা অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। আর এই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়েই আওয়ামী লীগ বা তাদের পেছনের শক্তিগুলো মাঠের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান ফিরে পাওয়ার সুপ্ত ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের রসদ খুঁজে পাবে। তাই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের শহিদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি এড়াতে এই দুই দলেরই অতিমাত্রায় দলীয় সংকীর্ণতা পরিহার করে অত্যন্ত পরিপক্ব ও দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন সচেতন মহল।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও তাদের রাজনৈতিক উচ্চাঙ্ক্ষা প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, 'জামায়াত প্রায় দুই যুগের জোটসঙ্গী। তারা নির্যাতিত নিঃসন্দেহে। তবে তারা এ দেশ স্বাধীন করেনি, আমরা করেছি। তারা যদি মনে করে, রাজনীতির মাঠে একচ্ছত্র আধিপত্য করবে, তারা তা করতেই পারে।'
দ্রুত নির্বাচন দাবির প্রেক্ষাপটে জামায়াত নেতাদের সমালোচনার জবাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ মন্তব্য করেন, যাদের জনসমর্থন নেই এবং যারা জনগণের ভোটে জেতার সামর্থ্য রাখে না বা নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, কেবল তারাই এ ধরনের চিন্তাভাবনা করে থাকে।
(0)Comments