বিএনপির নেতৃত্বে সরকারের বয়স মাত্র সাত মাস। এখনই লংমার্চের মতো কঠিন কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১-দলীয় জোট। বিএনপি অবাক, বিস্মিত। সাধারণত নির্বাচিত সরকারের মেয়াদের শেষের দিকে লংমার্চের মতো কঠিন কর্মসূচি দেওয়া হয়। শুরুতেই এমন কর্মসূচিকে বিএনপির নেতৃত্ব 'ষড়যন্ত্র' বলে সন্দেহ করছে। কতিথ ষড়যন্ত্রে পা না দিয়ে বিএনপি সতর্ক এবং কৌশলী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। বিএনপি নেতারা মনে করেন, বিরোধী দল এমন কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে ফাঁদে ফেলতে চাইছে। সরকার যদি তাদের কর্মসূচিতে বাধা দেয় তবে 'ঘোলা পানিতে মাছ শিকার' করবে। অর্থাৎ রাজপথে কর্মসূচির দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ রেখে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আড়াল করবে। কিন্তু বিএনপি লংমার্চে বাধা দেয়নি। বরং সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল গ্রহণ করেছে।
জনমনে প্রশ্ন উঠছে সংসদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব থাকা সত্ত্বেও বিরোধীরা এত দ্রুত রাজপথ বেছে নিচ্ছে। এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র আছে কি না এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। বিএনপির দায়িত্বশীলরা বলছেন, বিরোধী দলের এসব কর্মসূচি মোকাবিলায় কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করেছে তারা। পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে রাজপথ উত্যপ্ত করবে না। পাশাপাশি বিরোধীদের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক তিন স্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে। এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেছে, অনেকটা ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে বিএনপি। মাত্র সাত মাসের একটি সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা যেভাবে অবস্থান গ্রহণ করেছে তা অনেকাংশেই অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় আক্রমণ।
জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, লংমার্চের নামে বিরোধী দল ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে। সাধারণ জনগণ তাদের এ ভূমিকা ভালোভাবে দেখছে না। দায়িত্বশীল বিরোধী দলের মতো সংসদে নিজেদের দাবি বা প্রস্তাব না তুলে তারা রাজপথ বেছে নিয়েছে। যা মূলত সরকারের সার্বিক উন্নয়ন ঢাকা দেওয়ারই অপচেষ্টা। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধী দল সংসদের ভিতরে ও বাইরে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক আন্দোলন করছে। লংমার্চও হবে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি। সরকার উৎখাতের কোনো আন্দোলন বিরোধী দল করছে না। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন সরকার মাত্র সাত মাস দায়িত্ব পালন করেছে। এ সময় অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট রয়েছে। অতীত সময়ের জঞ্জাল পরিষ্কার হওয়ার জন্য সময়ের প্রয়োজন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ধারাবাহিক আন্দোলন-কর্মসূচি থেকে সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছে। প্রতিটি আন্দোলন ও কর্মসূচির বিপরীতে রাজপথে পাল্টা কর্মসূচি দিলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। এতে বিরোধীদের আন্দোলন মোকাবিলার পরিবর্তে সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের পরিবর্তে রাজনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, দলীয় সংগঠনকে সক্রিয় রাখা এবং প্রশাসনিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নজরদারি-এই তিন স্তরের সমন্বিত কৌশলে এগোতে চাইছে বিএনপি।
পাল্টাপাল্টি নয় : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আন্দোলন ও পাল্টা আন্দোলনের কারণে বহু সময় রাজপথ সংঘাতমুখর হয়েছে। পাল্টাপাল্টি মিছিল, সমাবেশ এবং শক্তি প্রদর্শন কখনো কখনো রাজনৈতিক উত্তেজনাকে সহিংসতার দিকে নিয়ে গেছে। এ অভিজ্ঞতা থেকেই বিএনপি এবার ভিন্ন পথে হাঁটতে চাইছে। দলটির একটি সূত্রের ভাষ্য, সরকারে থাকা অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের প্রধান দায়িত্ব রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। ফলে বিরোধীদের কর্মসূচি মোকাবিলার নামে রাজপথ দখলের প্রতিযোগিতায় নামলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেই বিবেচনায় সংযত অবস্থান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংগঠনকে সক্রিয় রাখা : রাজপথে সরাসরি সংঘাতে না গেলেও সাংগঠনিকভাবে বিরোধীদের তৎপরতার জবাব দিতে চায় বিএনপি। এ জন্য কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে সক্রিয় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের নিজ নিজ এলাকায় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে বলা হতে পারে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে সরকারের কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দলের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, শক্তিশালী ও সুসংগঠিত দলীয় কাঠামো থাকলে বিরোধীদের আন্দোলনের চাপ মোকাবিলায় সব সময় রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজন হয় না। জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং সংগঠনের সক্রিয়তাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিকভাবে জবাব : বিরোধীদের অভিযোগ ও সমালোচনার জবাব দিতে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ওপর গুরুত্ব দিতে চায় বিএনপি। দলটির নেতারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন এবং গণমাধ্যমে সরকারের অবস্থান তুলে ধরার পরিকল্পনা করছেন। বিশেষ করে বিরোধীদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে তথ্যভিত্তিক জবাব দেওয়ার বিষয়ে দলের ভিতরে আলোচনা রয়েছে। বিএনপির নেতাদের একটি অংশ মনে করছে, সব অভিযোগকে রাজনৈতিক সংঘাতের মাধ্যমে মোকাবিলা করার পরিবর্তে যুক্তি ও তথ্য দিয়ে জবাব দিলে জনমনে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছানো সম্ভব।
প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে সতর্কতা : বিরোধী আন্দোলন মোকাবিলায় প্রশাসনিক ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়ে বিএনপিকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের অধিকার রয়েছে। তবে জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হলে প্রশাসন তার আইনগত দায়িত্ব পালন করবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মোকাবিলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে-এমন অভিযোগ এড়াতে চায় ক্ষমতাসীন দল। কারণ সরকারে থাকা অবস্থায় দলটির প্রতিটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই জনমত এবং বিরোধীদের কঠোর পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকবে।
(0)Comments