১২৯ বার সময় নেওয়ার পর টাস্কফোর্স কি সাগর-রুনি হত্যার রহস্য উন্মোচন করতে পারবে?

১২৯ বার সময় নেওয়ার পর টাস্কফোর্স কি সাগর-রুনি হত্যার রহস্য উন্মোচন করতে পারবে?
View on original source
Category: Politics
Share
Archive
Like
আমি দৈনিক ইনকিলাবে বিগত প্রায় ৩৭ বছর হলো প্রধানত রাজনীতির ওপরেই লিখছি। যতদূর মনে পড়ে, ক্রাইম বা অপরাধ নিয়ে আমি কোনো লেখাই লিখিনি, অথবা লিখে থাকলেও হয়তো মাত্র দু'-চারটি লেখা লিখেছি। কিন্তু আজ ৩৭ বছর পর সেই ক্রাইম নিয়েই লিখতে বসেছি। কারণ, সেই দুটি ক্রাইমের একটি ঘটেছে ৩০ বছর আগে। আরেকটি ঘটেছে সাড়ে ১৪ বছর আগে। শুধু আমি নই, দেশবাসী এটা ভেবে স্তম্ভিত হচ্ছেন যে, এই ৩০ বছরে অথবা সাড়ে ১৪ বছরেও এই দুটি অপরাধের কোনো কূল কিনারা হয়নি। এই দুটি মার্ডারের একটি হলো সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড। আরেকটি হলো সিনেমা জগতের নায়ক সালমান শাহর হত্যাকাণ্ড। সাগর এবং রুনি এক সাংবাদিক দম্পতি। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় এই সাংবাদিক দম্পতি নৃশংসভাবে খুন হন। সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক ছিলেন। রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার। সালমান শাহ ছিলেন বাংলাদেশের রূপালি পর্দার সুদর্শন যুবক এবং শোবিজের ভাষায় ড্যাশিং হিরো। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে সালমান শাহর মৃত্যু হয়। তিনি 'আত্মহত্যা' করেছিলেন, নাকি তাঁকে 'হত্যা' করা হয়েছিলো, এই প্রশ্নের মীমাংসা গত তিন দশকেও হয়নি। প্রথমেই সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গ। এ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি অবিশ^াস্য মনে হয় সেটি হলো, বিগত সাড়ে ১৪ বছরে এই হত্যা মামলায় ১২৯ বার সময় নেওয়া হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে দু'-চারজন আইনজ্ঞের সাথে কথা বলেছি। তারা বলেছেন যে, পৃথিবীর ইতিহাসে তাদের জানা মতে কোনো হত্যা মামলাতে ১২৯ বার সময় নেওয়ার নজির নাই। যাই হোক, মামলাটি হিমাগারেই চলে গিয়েছিলো বলে সকলেই ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর ড. ইউনূসের সরকারের আমলে এই মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। ইউনূস সরকার এই মামলার নিরপেক্ষ ও খুঁটিনাটি তদন্তের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। সেই টাস্কফোর্সটি এখনো কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এই মামলা নিয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ক্রিমিনাল লইয়ার এবং সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে এমন সাংবাদিকদের মতামত পাওয়া গেছে। তবে সাড়ে ১৪ বছরের পুরাতন এই মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটার আমিনুল ইসলামের একটি তথ্য সর্ব সাধারণের মনে তুমুল আলোড়নের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন যে, অন্য একটি মামলার কল রেকর্ড পরীক্ষা করতে গিয়ে আইসিটির বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য পান। সাংবাদিকদের কাছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি প্রকাশ করা হয়। বলা হয় যে, এই হত্যাকাণ্ডে কুখ্যাত রাষ্ট্রীয় ঘাতক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান এবং একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের জড়িত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। জিয়াউল আহসান এই ধরনের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকবেন, সেই বিষয়ে কেউ আশ্চর্য হননি। কারণ, ইতোমধ্যেই তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা চলমান। চিফ প্রসিকিউটার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নাম বলেননি। কিন্তু পরদিন একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান সংবাদে ওই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নাম প্রকাশ করে। তিনি হলেন, আওয়ামী লীগের একজন নারী নেত্রী, অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী। আলোচ্য দৈনিকটি রোকেয়া প্রাচীর নাম প্রকাশ করেছে ট্রাইব্যুনালের অপর একজন প্রসিকিউটারের নিকট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে। ঐ প্রসিকিউটার নিজের নাম ও পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছেন। এ ব্যাপারে একজন সিনিয়র সাংবাদিক, যিনি শুরু থেকেই এই মামলাটির পেছন সংঘটিত অপরাধের অনুসন্ধান করছেন, তিনি প্রশ্ন করেন, কেনো ১৪ বছর ধরে সাগর-রুনি হত্যা রহস্যের উদ্ঘাটন হলো না? এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, গত জুলাই বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের গভীরে যাওয়ার সুযোগ ছিলো না। তিনি বলেন, সাগর-রুনি হত্যার পেছনে কারা আছে, সেটি সম্পর্কে একটি ধারণা পেতে হলে আপনাকে কয়েক বছর পেছনে যেতে হবে। হত্যাকাণ্ডের পর দিনই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন অসংখ্য সাংবাদিক এবং জনগণের সামনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই খুনীদের ধরা হবে এবং হত্যা রহস্যের উন্মোচন করা হবে। তার পর ১৪ বছর পার হলো। কিন্তু ঐ ৪৮ ঘণ্টা আর পার হয়নি। এরপর আরেকটি মন্তব্য করেন তৎকালীন পুলিশ প্রধান আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার। তিনি বলেন, যে ক্লু পাওয়া গেছে তার ফলে এই হত্যা রহস্যের উদ্ঘাটনে 'প্রণিধানযোগ্য' অগ্রগতি হয়েছে। ওই সাংবাদিক বলেন যে, সাগর-রুনি হত্যা রহস্য উন্মোচনে সমস্ত সাংবাদিক ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন এবং তারা রাজপথেও নেমেছিলেন। কিন্তু তারপর দেখা গেলো, হঠাৎ করে ওই সাংবাদিকদের মধ্যেই কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার পদ পেলেন, কেউ কেউ টেলিভিশনের লাইসেন্স পেলেন এবং কারো কারো বড় বড় পোস্টে পদায়ন হলো। গত ৫ সেপ্টেম্বর চ্যানেল ওয়ানের এক টকশোতে তিনি সোজা সাপ্টা বলেন যে, সাগর-রুনির রক্ত বেচে টেলিভিশন চ্যানেল খোলা হয়েছে। যারা আন্দোলন করছিলেন তাদের মধ্যেই কাউকে কাউকে দেখা গেলো, হঠাৎ করে নতুন ঝকঝকে প্রাডো মোটরগাড়িতে চড়ে ঘুরছেন। ওই সাংবাদিকের মতে, সাংবাদিকদের আন্দোলন এই রকম প্রলোভনের শিকার হয়ে ভেস্তে গেলো। যারা টোপ গিললো না তাদের তো জীবন নিয়ে টানাটানি। এই নিয়ে, তার কথায়, প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের মধ্যে মারামারি ও হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছে। সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বলেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ৪ দিনের মাথায় সংশ্লিষ্ট থানার হাত থেকে ডিবির কাছে চলে গেলো কেনো? এই ৪ দিনে যতটুকু সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগৃহীত হয়েছিলো সেগুলোও ডিবির হাতে গেলো। অথচ, ডিবি এটি নিয়ে এগুতে কি না এগুতেই মামলাটি দুই মাসের মাথায় ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল র‌্যাবের হাতে গেলো কেনো? র‌্যাবের হাতে এটি থাকলো ১২টি বছর। এই ১২টি বছর র‌্যাব কী করেছে? আজ পর্যন্ত তার কোনো জবাবদিহি নাই। ১২ বছর পর্যন্ত র‌্যাব এই মামলার ওপর বসে থাকলো। তারা যদি কিছুই না পেয়ে থাকে তাহলে তারা মামলাটি ক্লোজ করলো না কেনো? এখনো সেই মামলা ওপেন রয়েছে কেনো? এই ১২ বছরে পুলিশ, ডিবি এবং র‌্যাব যা কিছুই তথ্য পেয়েছে সেগুলো চলে গেছে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারে (এনটিএমসি)। এখন এনটিএমসিকেই তো সন্দেহ করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, তাহলে কি সরিষার মধ্যেই ভূত রয়েছে? ॥তিন॥ সাগর-রুনি নাকি এনার্জি বাংলা বলে একটা সাইট চালাতেন। তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করার পর সন্দেহের তীর চলে গেছে ওই এনার্জি বাংলা সাইটের দিকে। তাহলে কি ওই সাইটে সাগর-রুনি এমন কিছু পেয়েছিলেন বা সংরক্ষিত করেছিলেন, যার মধ্যে ছিলো অনেক উচ্চমহলের প্রাণ ভোমরা? আইসিটি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেছেন, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গিয়ে একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস/সার্ভার ও পুরোনো নথি পাওয়া যায়। সেখানে ২০০৭ সাল থেকে পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন তথ্য ছিল। কিছু ডিলিট করা ফাইলও উদ্ধার করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ৩/৪ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। তাঁদের একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেই জিজ্ঞাসাবাদ থেকে সাগর-রুনি হত্যার আগের রাত সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যায়। জোহার বক্তব্য অনুযায়ী, র‌্যাবের তৎকালীন ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের একজন কর্মকর্তাকে হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে বলা হয়েছিল, 'একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে'। কিন্তু কী ঘটতে যাচ্ছে, তা তাঁকে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। পরদিন সকালে তিনি সাগর-রুনি হত্যার খবর জানতে পারেন। এই কারণেই জনাব জোহা হত্যাকাণ্ডটিকে State-sponsored murder হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ॥চার॥ এর আগে যখন এনার্জি বাংলার দিকে সন্দেহের তীর যায় তখন বাজারে, সাংবাদিক মহলে এবং সচিবালয়ে নানান ভয়ংকর কথা ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে বলতে চান যে, অনেক উঁচু মহলের লুণ্ঠনের তথ্য সাগর-রুনির ল্যাপটপে সংরক্ষিত আছে। কিন্তু রোকেয়া প্রাচীর নাম আসার পর বলা হচ্ছে যে, বিডিআর ম্যাসাকারের প্ল্যানিংয়ের ভিডিও ক্লিপ রোকেয়া প্রাচীর কাছে ছিলো। খুনী জিয়াউল আহসান রোকেয়া প্রাচীর কাছ থেকে ওই ভিডিওটি দুই দিন পর নিয়ে যান। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল হাসান চ্যানেল ওয়ানের টকশোতে ৫ সেপ্টেম্বর প্রশ্ন করেছেন যে, হাইকোর্ট কেনো ১০০ বারেরও বেশি সময় সরকারকে দিলো? শেখ হাসিনার সময় শুধু হাইকোর্ট নয়, সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে ডেকে হুকুম করেছিলেন যে পরদিন সিনহা যেনো ষোড়শ সংশোধনীর রায় সরকারের পক্ষে দেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর ইউটিউবে স্বয়ং এসকে সিনহা এই কাহিনী বর্ণনা করেছেন। সেই সূত্র ধরে প্রশ্ন ওঠে, হাইকোর্ট কার নির্দেশে শতবার সময় দিলো? একথা এখন আর কারো জানতে বাকি নাই যে, সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ড কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়। জুলাই বিপ্লবের পর ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর একটি টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে। এখন চলছে সেপ্টেম্বর মাস। আর কয়েক দিন পরেই এই টাস্কফোর্সেরও এক বছর পূরণ হবে। সেই সাথে সাগর-রুনি হত্যার ১৫ বছর পূরণ হবে। যারা এই বিভৎস হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড এবং যেসব ঘাতককে এই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছে তাদের মুখোশ কবে উন্মোচিত হবে? বর্তমান নির্বাচিত সরকারের নিকট জনগণের প্রত্যাশা বিপুল। আজ আর স্থান সংকুলান হচ্ছে না বলে সালমান শাহর হত্যাকাণ্ড নিয়ে কিছু লেখা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এতদিন পর্যন্ত সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে চালানো হয়েছিলো। কিন্তু গড ফাদার ডনের গ্রেফতারের পর তার নিহত হওয়ার ঘটনা নতুন এবং নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ঊসধরষ:লড়ঁৎহধষরংঃ১৫@মসধরষ.পড়স

(0)Comments

 

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.