বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ কেবল বিদ্যুৎ বা জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় নয়। বরং সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করা জরুরি। সংকট মোকাবিলার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সক্ষমতা ও সহনশীলতা অর্জন, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনা এবং স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পরিবর্তে প্রয়োজন কৌশলগত পরিকল্পনা। গতকাল রাজধানীর রমনায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিস) মিলনায়তনে 'বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা : সংকট ব্যবস্থাপনা থেকে স্থিতিস্থাপক জ্বালানি রূপান্তর' শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির ব্যবস্থার ফলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। জ্বালানিসংকটের কারণে বর্তমানে জনগণ যে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, তার জন্য সরকার সমব্যথী। তবে বাস্তবতা আড়াল করে কোনো 'মিরাকল ন্যারেটিভ' তৈরি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হবে না।
তিনি বলেন, সরকার যখন দায়িত্ব নেয় তখন বিদ্যুৎ খাতের অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ভঙ্গুর ও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত। পাশাপাশি এতে কোনো কৌশলগত দিকনির্দেশনাও ছিল না। বর্তমানে আমরা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, তা আসলে একটি ফাঁদ। আর এই ফাঁদটি পূর্ববর্তী সরকার আমদানিনির্ভরতার মাধ্যমে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি করেছিল। উপদেষ্টা আরও বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বজনপ্রীতি, ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর আধিপত্য এবং আমদানিনির্ভরতা গভীরভাবে শিকড় গেড়েছিল। আর এখন আমরা সেই পুঞ্জীভূত সমস্যারই মাশুল দিচ্ছি।
স্বাগত বক্তব্যে বিসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় সক্ষমতা ও সহনশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো জ্বালানিনিরাপত্তা। এজন্য অভ্যন্তরীণ জ্বালানি অনুসন্ধান, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, গ্রিড ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে মাহফুজ কবির বলেন, আগস্টে দেশে গ্যাসের গড় সরবরাহ চাহিদার মাত্র ৫৫ শতাংশে নেমে আসে। এতে নরসিংদী, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা খেলাপি হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। ব্যাংক খাতেও বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মঞ্জুর আলম প্রধান বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশে তেলের মজুত সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। ইএসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এজাজ হোসেন বলেন, ২০১৫ সালে আমদানির নির্ভরতা মাত্র ২০ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি এড়াতে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় দেশে জ্বালানির সঠিক কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুত গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এ ছাড়া সেমিনারে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
(0)Comments