যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির বাইরে নতুন একটি 'নিয়ন্ত্রিত' সামুদ্রিক অঞ্চল ঘোষণা করতে যাচ্ছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) প্রধান মোহসেন রেজাই বলেছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ অঞ্চল কার্যকর করা হবে। তিনি জানান, 'নিয়ন্ত্রিত' নতুন সামুদ্রিক অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধের সীমারেখা থেকে শুরু হয়ে উপসাগরের কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ইরানের এই শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সতর্ক বলেছেন, ওই এলাকায় প্রবেশ করা যেকোনো জাহাজকে নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত করা হবে। রেজাই বলেন, হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নতুন একটি নৌপথ চালুর বিষয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইরান ও ওমানের মধ্যে চুক্তি হতে পারে। ওই নৌপথের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন হরমুজ প্রণালি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ট্রাম্পের এমন দাবিকে 'বড় ধরনের মিথ্যা' বলে মন্তব্য করেন ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান। তার দাবি, হরমুজ প্রণালি 'পুরোপুরি বন্ধ' এবং এটি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রেজাই বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার আগে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজে ১০ কোটি টনেরও বেশি পণ্য পরিবহন হতো। এখন ইরানের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য বহনকারী মাত্র সাত-আটটি জাহাজ এই সমুদ্রপথ দিয়ে চলাচল করছে বলে জানান তিনি। রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অনেক খরচ করে পাঁচ-ছয়টি জাহাজ পার করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এসব জাহাজে সাধারণত হামলা হয়। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি। জাহাজগুলো তেল বহন করায় ইরান সেগুলো ডুবিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানান রেজাই। কারণ, এতে ওই অঞ্চলের পরিবেশের ক্ষতি হবে।
এ ছাড়া প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি জাহাজের ওপর নতুন জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালানোর দাবিও করেন রেজাই। তিনি বলেন, এই বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের জন্য নরক তৈরি করেছিল এবং তারা পালিয়ে যায়। তবে কোন জাহাজের ওপর এবং কোথায় ওই পরীক্ষা চালানো হয়েছিল, তা জানাননি তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইরানে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার দাবিও নাকচ করেছেন রেজাই। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইরানে বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে এই দাবি ভুল। তিনি বলেন, ইরান সরকার অনেক আগে থেকেই এ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ রয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের জবাবে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরান। গতকাল সোমবার সংসদ সদস্যদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ বলেন, আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোতে ইরান ইতিমধ্যে 'প্রচণ্ড আঘাত' হেনেছে, যা ওয়াশিংটনের নেতাদের মারাত্মক হতাশায় ফেলেছে। হুঁশিয়ারি দিয়ে গালিবাফ বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে ভারসাম্যপূর্ণ বা সমানুপাতিক জবাব দেওয়ার দিন এখন শেষ হয়ে গেছে। আগ্রাসী বাহিনীর ঘাঁটিতে আমাদের সাম্প্রতিক হামলাগুলো ছিল কেবল শুরু মাত্র।' তিনি আরও সতর্ক করে জানান, ইরানের স্বার্থে আঘাত হেনে এরপর থেকে নতুন করে যেকোনো ধরনের হামলা চালানো হলে, তার জবাবে তেহরানের পক্ষ থেকে 'আরও দ্রুত, ভারী এবং অধিক যন্ত্রণাদায়ক' আক্রমণ চালানো হবে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই অঞ্চলটিতে সংঘাতের শুরু হয়। এর জবাবে ইসরায়েল এবং পশ্চিম এশিয়াজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। টানা চার মাস যুদ্ধের পর গত জুনে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা স্মারক সই করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এতে সংঘাত বন্ধ, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া এবং অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ নিয়ে সমাধানের পথে এগোনোর বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল। তবে এরপর দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে ওই সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ তুলে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু করে। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি দুই পক্ষের সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে।
(0)Comments