মূল্যস্ফীতি কমলেও লক্ষণ নেই বাজারে

মূল্যস্ফীতি কমলেও লক্ষণ নেই বাজারে
View on original source
Category: Financial
Share
Archive
Like
দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার টানা দ্বিতীয় মাসের মতো কিছুটা কমেছে। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে। পরিসংখ্যানের হিসাবে এটি স্বস্তির খবর হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে সেই স্বস্তির প্রতিফলন কতটা পড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ বাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো আগের বছরের তুলনায় পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। ফলে যে পণ্যটি এক বছর আগে ১০০ টাকা ছিল, সেটি ১০৮ বা ১১০ টাকা হওয়ার বদলে হয়তো কিছুটা কম হারে বেড়েছে; কিন্তু আগের বাড়তি দামটি বাজারে থেকেই গেছে। সোমবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত ভোক্তা মূল্য সূচক ও মূল্যস্ফীতির হিসাব থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বিবিএসের হিসাবে, ২০২৫ সালের আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। চলতি বছরের আগস্টে তা সামান্য কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও এক বছরের ব্যবধানে ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমেছে। তবে মাসভিত্তিক হিসাবে পরিস্থিতি ভিন্ন। আগস্টে সামগ্রিক ভোক্তা মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় ২ দশমিক ৩১ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক বেড়েছে ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির বার্ষিক হার কমলেও এক মাসের ব্যবধানে খাদ্যপণ্যের দাম সামগ্রিকভাবে কমেনি, বরং বেড়েছে। এ কারণেই সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমার খবর থাকলেও বাজারে গিয়ে স্বস্তি পাচ্ছেন না ভোক্তারা। নিত্যপণ্যের দাম কমেনি, বেড়েছে সংসারের ব্যয়; চাল, ডাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, কাঁচামরিচ, সবজি, মাছ, মাংস ও ডিম—প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় এসব পণ্যের বাজার এখনো সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয়বহুল। ঢাকার খুচরা বাজারের সরকারি দরের হিসাবে মোটা চাল প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৫২ টাকা, মাঝারি চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং সরু চালের বিভিন্ন ধরনের দাম ৬৫ থেকে ৯৫ টাকা পর্যন্ত রয়েছে। খোলা আটা বিক্রি হচ্ছে ৪৬ থেকে ৫০ টাকা কেজি। মসুর ডাল ৯০ থেকে ১০০ টাকা, মুগ ডাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং ছোলা ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮৫ থেকে ১৮৯ টাকা এবং বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৯ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে। চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১২ টাকা কেজি। দেশি পেঁয়াজের দাম ৪৫ থেকে ৬০ টাকা। সবজির বাজারেও স্বস্তি সীমিত। আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকা, বেগুন ৬০ থেকে ১২০ টাকা এবং লাউ ৩০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি রসুন ৮০ থেকে ১১০ টাকা, চায়না রসুন ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা এবং আমদানি করা আদা ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি। কাঁচামরিচের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। মাছ, মাংস ও ডিমের বাজারও নিম্ন ও মধ্যবিত্তের খাদ্য বাজেটে বড় চাপ তৈরি করছে। রুই মাছ ৩৪০ থেকে ৫০০ টাকা, কাতল ৩২০ থেকে ৪৮০ টাকা, পাঙ্গাস ১৮০ থেকে ২৫০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগি ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের ডিমের দাম প্রতিটি ১১ টাকা ২৫ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৫০ পয়সা। ফলে কোনো একটি পণ্যের দাম সাময়িকভাবে কমলেও পরিবারের মোট বাজার খরচে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরছে না। বরং এক পণ্যের দাম কমার সঙ্গে অন্য পণ্যের দাম বাড়ায় মাসিক ব্যয়ের চাপ থেকেই যাচ্ছে। মজুরি বৃদ্ধির গতি কম, প্রকৃত আয় আরও চাপে: মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি মানুষের আয় বা মজুরি বৃদ্ধির চিত্রও উদ্বেগ তৈরি করছে। বিবিএসের হিসাবে, আগস্টে জাতীয় পর্যায়ে মজুরি হার সূচকের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। গত বছরের আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানেও মজুরি বৃদ্ধির গতি কমেছে। আর এখানেই তৈরি হয়েছে বড় বৈপরীত্য। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি যেখানে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, সেখানে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে শূন্য দশমিক ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। সহজ হিসাবে, একজন শ্রমজীবী মানুষের আয় nominal বা নামমাত্র হিসাবে বাড়লেও সেই বাড়তি আয় দিয়ে আগের তুলনায় বেশি পণ্য কেনা সম্ভব হচ্ছে না। বরং পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার হার আয় বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হওয়ায় প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা চাপে পড়ছে। খাতভিত্তিক হিসাবেও একই চিত্র। আগস্টে কৃষি খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, শিল্প খাতে ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। তিনটি খাতের কোনোটিতেই মজুরি বৃদ্ধির হার সার্বিক মূল্যস্ফীতিকে ছাড়াতে পারেনি। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারে। যাদের আয়ের বড় অংশ খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয়, তাদের হাতে সঞ্চয়ের সুযোগ কমে যায়। অনেক পরিবারকে জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে খাদ্যতালিকা ছোট করা, কম দামের পণ্য বেছে নেওয়া কিংবা অন্যান্য ব্যয় কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। খাদ্য কমলেও খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় বাড়ছে: মূল্যস্ফীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাদ্যবহির্ভূত খাত। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। জুলাইয়ের ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে আগস্টে এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে। গত বছরের আগস্টে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের ওপর চাপ শুধু বাজারের খাদ্যপণ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাসস্থান, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, পরিবহন, পোশাক, জুতা, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন সেবার ব্যয়ও বাড়ছে। আগস্টে রেস্তোরাঁ ও হোটেল খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। পোশাক ও জুতায় ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, বাসস্থান, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানিতে ৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং পরিবহন খাতে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। গ্রাম ও শহরের চিত্রেও একই ধরনের চাপ রয়েছে। আগস্টে গ্রামীণ এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ, জুলাইয়ে যা ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০১ শতাংশে নামলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। শহরাঞ্চলে আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২০ শতাংশ, জুলাইয়ে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রাম বা শহর—কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি কমেনি। সামনে বড় চ্যালেঞ্জ প্রকৃত আয় ও বাজারের স্থিতিশীলতা: বিবিএসের তথ্য বলছে, মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে মানুষের জীবনে এর প্রকৃত সুফল পেতে হলে শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানো যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে হবে এবং মজুরি বৃদ্ধির হারকে মূল্যস্ফীতির ওপরে নিতে হবে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মানুষের প্রকৃত আয়। নামমাত্র মজুরি বাড়লেও যদি একই সময়ে খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় আরও বেশি হারে বাড়ে, তাহলে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আসে না। দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে পরিবারের সঞ্চয় কমতে পারে, ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে এবং ভোগক্ষমতা কমে যেতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন স্থির বা কম আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাজারে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো, উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগীর চাপ কমানো এবং পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। আগস্টের পরিসংখ্যান তাই অর্থনীতিকে একটি দ্বৈত বার্তা দিচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমেছে—যা ইতিবাচক। অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির হারও কমেছে এবং তা মূল্যস্ফীতির নিচে রয়েছে—যা মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার জন্য সতর্কবার্তা। শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে অর্থনীতির সাফল্যের মাপকাঠি শুধু মূল্যস্ফীতির সংখ্যা নয়। মাস শেষে আয় দিয়ে কতটা স্বস্তিতে সংসার চালানো যাচ্ছে, সন্তানদের প্রয়োজন মেটানো যাচ্ছে এবং সামান্য হলেও সঞ্চয় করা যাচ্ছে কি না—সেই হিসাবই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমেছে। কিন্তু বাজারে স্বস্তি ফেরাতে হলে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো মানুষের আয়কে মূল্যস্ফীতির চেয়ে দ্রুত বাড়ানো এবং নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা। সেই জায়গায় পৌঁছানোই হবে আগামী দিনের বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষা।

(0)Comments

 

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.