ইরান ইস্যুতে চীনের কূটনৈতিক ভারসাম্যের খেলা

ইরান ইস্যুতে চীনের কূটনৈতিক ভারসাম্যের খেলা
View on original source
Category: Politics
Share
Archive
Like
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে চীনের সূক্ষ্ম কূটনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ দেশের এই জোট ইরানের বিরুদ্ধে 'সামরিক হামলার' নিন্দা জানিয়ে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তুলে ধরেছে। তবে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেননি। ইরানি সংবাদমাধ্যমের খবরে দুই নেতার মধ্যে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের কথা বলা হলেও, এ বিষয়ে চীনা সরকার কোনো বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। এতে স্পষ্ট হয়েছে, চীন কতটা সতর্কতার সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখছে। একদিকে কৌশলগত সম্পর্ক অটুট রাখতে ইরানকে প্রয়োজনীয় সমর্থন দিচ্ছে বেইজিং, অন্যদিকে প্রকাশ্যে এমন কোনো অবস্থানও নিচ্ছে না, যাতে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে এসসিওর বিবৃতি অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। চীন ও রাশিয়ার প্রভাবাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তাবিষয়ক এই জোট প্রায়ই পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পাল্টা শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। তবে চীনের নীরব ও সংযত অবস্থান—বিশেষ করে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের সংক্ষিপ্ত কথোপকথন নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ না করা—ইঙ্গিত দেয়, ইরানের অভিযোগকে সম্মেলনের আলোচ্যসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে যেতে বেইজিং আগ্রহী নয়। এর পরিবর্তে চীন এসসিওর ঐকমত্যকে বিস্তৃত ও প্রতীকী পর্যায়ে রাখতে চায়। একই সঙ্গে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি বা পদক্ষেপ এড়িয়ে চলতে চায়, যা বৈশ্বিক পরিসরে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চীনা কৌশলকে জটিল করে তুলতে পারে। কেন ইরানকে কাছে রাখলেও দূরত্ব বজায় রাখছে চীন কৌশলগত গুরুত্ব: ইরান চীনকে কম দামে জ্বালানি সরবরাহ, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবেশাধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্বের সুযোগ দেয়। ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি: তেহরানকে প্রকাশ্যে ঘনিষ্ঠভাবে সমর্থন করলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চীনের বিরোধ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্য, তাইওয়ান ও প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক এমনিতেই উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। উপসাগরীয় অংশীদারত্ব: সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চীন গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ইরানের দিকে দৃশ্যমানভাবে ঝুঁকে পড়লে এসব সম্পর্ক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, বিশেষ করে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে। কূটনৈতিক কৌশল: শি জিনপিং ইরানের সঙ্গে যোগাযোগকে একটি সংক্ষিপ্ত ও আনুষ্ঠানিকভাবে নথিবিহীন কথোপকথনের মধ্যে সীমিত রেখে একদিকে সমর্থনের বার্তা দিচ্ছেন, অন্যদিকে ইরানের সংঘাতমুখী অবস্থানের সঙ্গে চীনকে সরাসরি আবদ্ধ করছেন না। উপসাগরীয় সমীকরণ উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত চীনের সরবরাহব্যবস্থা ও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব বেইজিংয়ের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দুই দেশই ইরানকে সন্দেহের চোখে দেখে। আর বেইজিং জানে, তেহরানের সঙ্গে প্রকাশ্যে ঘনিষ্ঠ অবস্থান নিলে নিরপেক্ষ অংশীদার হিসেবে চীনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বিশকেকে চীনের নীরবতা কোনো সিদ্ধান্তহীনতা ছিল না—এটি ছিল সুনির্দিষ্ট কৌশল। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চীনের এই কৌশল মনে করিয়ে দেয়, বেইজিং একই সঙ্গে সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটন চীনকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে ধরে নিতে পারে না। আবার বেইজিং তেহরানের পক্ষ পুরোপুরি নেবে—এমনটিও ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বরং চীনের কৌশল মূলত স্বার্থনির্ভর। যেখানে ইরানকে সমর্থন করা চীনের জন্য লাভজনক, সেখানে বেইজিং তেহরানের পাশে থাকবে। কিন্তু সেই সমর্থনের খরচ যদি সম্ভাব্য লাভের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন চীন ঝুঁকি এড়িয়ে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেবে। চীনের এই ভারসাম্যনীতি ইরানের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলছে। কারণ, বেইজিং একই সঙ্গে সব পক্ষের জন্য নিজেকে অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত অস্পষ্টতা এসসিও সম্মেলনে সংঘাত এড়িয়ে কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রাখার চীনা নীতিই স্পষ্ট হয়েছে। ইরানের ওপর হামলার সম্মিলিত নিন্দা জানালেও দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে বিষয়টিকে বড় করে না তুলে বেইজিং একদিকে তেহরানের কাছে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রেখেছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বৃহত্তর পরিসরে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত করেছে। এটি কোনো সিদ্ধান্তহীনতা নয়; বরং সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত কূটনৈতিক কৌশল। চীনের এই ভারসাম্যনীতির মূল লক্ষ্য কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়া নয়, বরং এমন অবস্থান নিশ্চিত করা, যাতে কখনোই কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার প্রয়োজন না হয়। ইউরোপিয়ান টাইমসে প্রকাশিত নিবন্ধ

(0)Comments

 

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.