কেইপিজেড: সবুজ শিল্পায়নের মডেল, রপ্তানি বিলিয়ন ডলার!
জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২৮ অপরাহ্ন
একসময় পতিত পাহাড়ি জমি আর ঊষর ভূমি ছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারার সেই প্রায় আড়াই হাজার একর এলাকা। আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে দেশের একমাত্র বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা- কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন, সংক্ষেপে কেইপিজেড।
তিন দশকের পথচলায় এই শিল্পাঞ্চলটি এখন শুধু কারখানার চিমনি আর শ্রমিকের পদচারণায় মুখর নয়, এখানে আছে ৩০ লাখ গাছের সারি, একটি বিশ্বমানের হাসপাতাল আর ইউরোপ-আমেরিকামুখী পণ্যবাহী রপ্তানি- যার বার্ষিক মূল্য এখন প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার পণ্য প্রতি বছর এখান থেকে বিশ্ববাজারে যাচ্ছে। জুতো, পরিবেশবান্ধব তৈরি পোশাক ও অত্যাধুনিক টেক্সটাইল সামগ্রী রপ্তানি করে এই শিল্পাঞ্চলটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে অনন্য অবদান রাখছে।
কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় গল্পটা অন্য জায়গায়- কেইপিজেড দেখিয়ে দিচ্ছে, পরিবেশ ধ্বংস করে নয়, পরিবেশ রক্ষা করেও শিল্পায়ন সম্ভব।
সবুজের মাঝে কারখানা
কেইপিজেডের মোট প্রকল্প এলাকার প্রায় ৫২ শতাংশ জমি সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ লাখ গাছ রোপণ করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণে এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কেইপিজেড লাভ করেছে মর্যাদাপূর্ণ বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার।
নিজস্ব রুফটপ সোলার প্যানেলভিত্তিক টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং বিশাল জলাধার এই শিল্পনগরীকে করেছে আরও পরিবেশবান্ধব।
মূল প্রতিষ্ঠান ইয়ংওয়ান করপোরেশনের চেয়ারম্যান কিহাক সাং-এর দূরদর্শী নেতৃত্বে উৎপাদিত উচ্চমানের পণ্য বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সুনামের সঙ্গে রপ্তানি হচ্ছে।
অত্যাধুনিক অবকাঠামো ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার কারণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে কেইপিজেড এখন একটি আকর্ষণীয় হাব।
শ্রমিকদের জন্য বিশ্বমানের হাসপাতাল
এই শিল্পাঞ্চলে কর্মরত প্রায় ৩১ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চালু হয়েছে সম্পূর্ণ অলাভজনক ১০০ শয্যাবিশিষ্ট কেইপিজেড ট্রাস্ট হসপিটাল।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত ইয়নসেই ইউনিভার্সিটি হেলথ সিস্টেমের (ওয়াইইউএইচএস) কারিগরি সহযোগিতায় নির্মিত এই হাসপাতালটি আসলে একটি পরিকল্পিত ৫০০ শয্যার বৃহৎ মেডিকেল কমপ্লেক্সের প্রথম ধাপ।
টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নও এগিয়ে চলছে
কোরিয়ান ইপিজেড করপোরেশন (বিডি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লে. কর্নেল (অব.) মো. শাহজাহান বলেন, 'আমরা শুধু রপ্তানি আয় বাড়ানো নয়, বরং কেইপিজেডকে একটি আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক আধুনিক টেকসই শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলেছি। পরিবেশ রক্ষা ও মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করেই শিল্পায়ন সম্ভব- এটাই আমরা প্রমাণ করেছি।'
শিক্ষা নিয়েও এই শিল্পাঞ্চলের পরিকল্পনা বড়। কেইপিজেড চত্বরে ইতিমধ্যে বেপজা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাজ চলছে। এর পাশাপাশি বিশেষায়িত টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে বলে জানান তিনি।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো চালু হলে স্থানীয় তরুণ প্রজন্ম তৈরি পোশাক ও আধুনিক টেক্সটাইল প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে।
অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কেইপিজেডের এই ধারাবাহিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বহুমুখীকরণ এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের পথে একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে কাজ করছে।
একটি পতিত পাহাড়ি জমি থেকে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি কেন্দ্র- এই রূপান্তরের গল্পটা বলে দেয়, সঠিক পরিকল্পনা আর দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে শিল্প ও প্রকৃতি একসঙ্গে চলতে পারে।
(0)Comments