ময়মনসিংহের ভালুকা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার আনোয়ারুল হাসানের বিরুদ্ধে ঘুষ, অনিয়ম ও দলিল লেখকদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। তার কথিত ঘনিষ্ঠ নকলনবিশ আবু সাঈদ ও নাঈমুল হাসানের বিরুদ্ধেও দলিলপ্রতি অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ করেছেন দলিল লেখকেরা।
এসব অভিযোগের প্রতিবাদে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) থেকে কর্মবিরতি শুরু করেছেন ভালুকা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখকেরা। এতে দলিল রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দলিল করতে এসে অনেকেই ফিরে গেছেন বলে জানা গেছে।
দলিল লেখকদের অভিযোগ, প্রতিটি দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় ব্যাংক চালানের জন্য সরকার নির্ধারিত ৩৬০ টাকা ফি'র বাইরে সমিতির নামে ১ হাজার ১০০ টাকা এবং বিশেষ ব্যক্তির নামে আরও ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রতি দলিলে অতিরিক্ত ২ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ অর্থ আদায়ের সঙ্গে নকলনবিশ আবু সাঈদ ও নাঈমুল হাসান জড়িত বলে তাদের অভিযোগ।
এ ছাড়া দলিলের মূল্যমানের ওপর 'সেরেস্তা খরচ' হিসেবে প্রতি লাখে ২০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে নকলনবিশ আবু সাঈদের বিরুদ্ধে। দলিল লেখকদের দাবি, এই অর্থ সরকারি কোনো রাজস্ব খাতে জমা দেওয়া হয় না।
দলিল লেখকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভালুকা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মাসে গড়ে প্রায় ১ হাজার দলিল রেজিস্ট্রেশন হয়। কোনো কোনো দলিলের মূল্যমান এক কোটি টাকারও বেশি। তাদের অভিযোগ, এক কোটি টাকা মূল্যের একটি দলিলের ক্ষেত্রে 'সেরেস্তা খরচ' হিসেবে ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে।
তাদের আরও অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই কার্যালয়ে প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার দলিল রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। এসব দলিলের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। দলিলের নকল উত্তোলনের সরকারি ফি ৪৮০ টাকা হলেও এর বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বণ্টননামা, ঘোষণাপত্র, ভুল সংশোধন ও ব্যাংক মর্টগেজসহ বিভিন্ন ধরনের দলিলের ক্ষেত্রে দলিলের ধরন অনুযায়ী ২ হাজার টাকা থেকে ৫–১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন দলিল লেখক। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দলিল লেখকগণ আরও অভিযোগ করেন, এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। সাব-রেজিস্ট্রার দলিল লেখকদের সনদ বাতিলের হুমকি দেন। ইতিমধ্যে কয়েকজন দলিল লেখককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
অসুস্থ দলিলদাতাদের ক্ষেত্রে ভিজিট কমিশনে গিয়ে দলিল সম্পাদনের জন্যও অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভালুকা এলাকায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা, ময়মনসিংহ এলাকায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং ঢাকায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কখনো কখনো সাব-রেজিস্ট্রার নিজে না গিয়ে অফিস সহায়ক আতিকুল ইসলামকে পাঠান বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
গত সোমবারও অন্তত ৩০টি দলিল রেজিস্ট্রেশন না করেই সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় ত্যাগ করেন বলে দলিল লেখকেরা অভিযোগ করেন। তবে সাব-রেজিস্ট্রার আনোয়ারুল হাসান বলেন, তার ছেলে অসুস্থ থাকায় তিনি কার্যালয় থেকে চলে যান। এ কারণে ১৫ থেকে ২০টি দলিল রেজিস্ট্রেশন করা সম্ভব হয়নি।
কর্মবিরতির কারণে মঙ্গলবার দলিল করতে এসে ভোগান্তিতে পড়েন জমির ক্রেতারাও। রাকিব সরকার নামের এক জমি ক্রেতা বলেন, 'আমি আজ একটি বায়নাপত্র দলিল রেজিস্ট্রি করতে এসেছিলাম। লেখকদের কর্মবিরতির কারণে দলিলটি সম্পন্ন হয়নি। কয়েক দিন আগে একটি জমি রেজিস্ট্রি করেছি। এ জন্য সাব-রেজিস্ট্রারকে ৪ হাজার টাকা বাড়তি দিতে হয়েছে।'
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাব-রেজিস্ট্রার আনোয়ারুল হাসান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'সোমবার আমার ছেলে অসুস্থ থাকার কারণে আমি চলে গিয়েছিলাম। এ কারণে ১৫ থেকে ২০টি দলিল রেজিস্ট্রেশন করা সম্ভব হয়নি।'
নকলনবিশ আবু সাঈদ ও নাঈমুল হাসানকে কোনো ধরনের টাকা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, 'বিভিন্ন অনিয়মের কারণে তিনজন দলিল লেখককে শোকজ করা হয়েছে।'
দলিল লেখকদের কর্মবিরতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'তাদের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন তিনি।'
বিপি/এএসএ
(0)Comments