ছবি : রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশের বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে সবচেয়ে বড় আশার প্রকল্প হিসেবে সামনে এসেছিল পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। চলতি মাসে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ভালভে কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ায় সেই প্রত্যাশায় বড় ধাক্কা লেগেছে। কবে নাগাদ সমস্যার সমাধান হবে এবং কবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ আসবে, নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না কোনো কর্তৃপক্ষই।
রূপপুর প্রকল্পের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুটি ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। পুরোপুরি চালু হলে কেন্দ্রটি দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করতে পারবে। ফলে গ্যাসের সংকট, জ্বালানি আমদানির চাপ এবং পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার মধ্যে রূপপুরকে দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বড় ভরসা হিসেবে আশার আলো হিসেবে দেখছিল সবাই। কিন্তু একের পর এক উদ্বোধনের তারিখ পেছানোর কারণে অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের অন্যতম উপায়টি। ভরসার প্রকল্পই এখন আটকে গেছে কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপে। দুই ভালভে ত্রুটি, আটকে গেছে পরবর্তী পরীক্ষা :
সম্প্রতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম রূপালী বাংলাদেশকে জানান, রূপপুরের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে একটি পর্যায় ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু দুটি ভালভে সমস্যার কারণে পরবর্তী ধাপে যাওয়া যাচ্ছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়সীমা পিছিয়ে গেছে। সমস্যাটি সমাধানের নির্দিষ্ট সময়ও এখনো জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ ইভি পিওআরভি-সংক্রান্ত ত্রুটি। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এ ধরনের ভালভ চুল্লির নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর আগে এ ধরনের ত্রুটি পুরোপুরি সমাধান ও যাচাই করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়ার চেয়ে নিরাপদভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কোনো যন্ত্রাংশে ত্রুটি থাকলে সেটি পাশ কাটিয়ে উৎপাদনে যাওয়ার সুযোগ নেই। একের পর এক সময়সীমা পেছাচ্ছে :
রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার সময় নিয়ে গত কয়েক মাসে একাধিক আশাবাদী ঘোষণা এসেছে। এপ্রিল মাসে প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হয়। তখন চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য সামনে রাখা হয়েছিল। গত জুনে সংসদে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আগস্টের শেষ নাগাদ প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে। পরে সেপ্টেম্বর মাসে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়। কিন্তু সেপ্টেম্বর শুরু হওয়ার পরই নিরাপত্তা ভালভের ত্রুটি সামনে আসে। এখন সেপ্টেম্বরে উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত। এমনকি চলতি বছরে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ১২০০ মেগাওয়াটের প্রত্যাশায় বড় ধাক্কা :
কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে মোট সক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পুরো প্রকল্প চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণের সক্ষমতা তৈরি হবে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে কাগজে-কলমে বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও বাস্তবে চাহিদার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রূপপুরের ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে অন্তত বেজলোড বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কিছুটা স্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারত। কিন্তু উৎপাদন শুরুর বিলম্ব সেই সম্ভাবনাকেই পিছিয়ে দিল। বিদ্যুৎ সংকট কি আরও দীর্ঘ হবে :
রূপপুরের বিলম্বকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দেশের বিদ্যুৎ খাত একই সময়ে একাধিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের সরবরাহ সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণমাত্রায় চালানো কঠিন হচ্ছে। আমদানি করা জ্বালানির দাম ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে। ফলে নতুন, তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বেজলোড উৎস হিসেবে রূপপুরের বিদ্যুৎকে কেন্দ্র করে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, উৎপাদন শুরুর বিলম্ব সেই চাপ আরও বাড়াতে পারে। তবে রূপপুরের বিলম্বকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক ছড়ানোর চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা জরুরি বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরাপত্তা পরীক্ষার কোনো ধাপ তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করা উচিত নয়। বরং ত্রুটি চিহ্নিত করে সেটি পুরোপুরি সমাধান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সন্তুষ্টি অর্জনের পরই পরবর্তী ধাপে যাওয়া উচিত। 'শেষ মুহূর্তের' ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন :
রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিট কমিশনিংয়ের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ভালভে ত্রুটি ধরা পড়ায় প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মাননিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে এত বড় এবং উচ্চঝুঁঁকির একটি প্রকল্পে যন্ত্রপাতির মান যাচাই, ইনস্টলেশনের পর পরীক্ষা এবং কমিশনিং-পূর্ব যাচাই কতটা কঠোরভাবে সম্পন্ন হয়েছে— সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ :
রূপপুর বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফলে এটি শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়। একই সঙ্গে দেশের পারমাণবিক নিরাপত্তাব্যবস্থার সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিএইআরএ) কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়ার পর প্রকল্পটি উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করে। এখন নিরাপত্তা ভালভের ত্রুটির পর পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ রূপপুর থেকে দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়া যেমন প্রয়োজন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে :
রূপপুর প্রকল্পের নির্মাণব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। এত বিপুল বিনিয়োগের পর উৎপাদন শুরু যত পিছিয়ে যাবে, প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার সময়ও তত পিছিয়ে যাবে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে সরকারকে গ্যাস, কয়লা, তেল বা বিদ্যুৎ আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হলে তার আর্থিক চাপও বাড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমানে গ্যাসের সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে বিঘ্ন তৈরি হচ্ছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলে তার অনেকটাই কাটত। এতে করে সরকারের আমদানি ব্যয়ও অনেকটাই কমে যেত। কিন্তু যেহেতু শেষ মুহূর্তে কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়েছে, তাই এখন যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই চালু করা উচিত বলে আমি মনে করি। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পারমাণবিক নিরাপত্তা। কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ কী বলছে :
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রূপপুরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বচ্ছভাবে জানানো— ভালভের ত্রুটিটি ঠিক কী ধরনের, কেন হয়েছে, কোন সংস্থা এটি মেরামত করছে, মেরামতের পর কী কী পরীক্ষা হবে এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার বাস্তবসম্মত নতুন সময়সূচি কী। কারণ বারবার সময়সীমা ঘোষণা করে সেটি পূরণ না হলে প্রকল্পের প্রতি জনসাধারণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
(0)Comments