উত্তাল সমুদ্রে বাংলার সিসাল দড়ি দিয়ে বাঁধা হত জাহাজ , বিধান রায়ের তৈরি কারখানা এখন ধ্বংসস্তুপ

উত্তাল সমুদ্রে বাংলার সিসাল দড়ি দিয়ে বাঁধা হত জাহাজ , বিধান রায়ের তৈরি কারখানা এখন ধ্বংসস্তুপ
View on original source
Category: Politics
Share
Archive
Like
রাজনগর (বীরভূম), 8 সেপ্টেম্বর: বিজ্ঞাপনে কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকার প্লাস্টিক বর্জনের কথা বলছে। অথচ, তিন দশক ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব সিসাল দড়ির কারখানা। বাজার ছেয়েছে নাইলনের দড়িতে ৷ 1961 সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধানচন্দ্র রায় বীরভূমের রাজনগরে গড়ে তুলে ছিলেন সিসাল দড়ির কারখানা। সেই সময় রাজনগরে কমপক্ষে 3 হাজার একর জমিজুড়ে চাষ হত সিসাল গাছের। স্থানীয় নাম কোঙা গাছ। এই গাছ থেকে মজবুত দড়ি তৈরি হত ৷ দড়িগুলি এতটাই মজবুত ছিল যে বন্দরে বড় বড় জাহাজকে বয়ার সঙ্গে বেঁধে রাখা হত ৷ এমনকী, নোনা জলেও নষ্ট হয় না সিসাল দড়ি ৷ আজ এসবই অতীত। কার্যত ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে সিসাল কারখানা ৷ জাহাজের বয়া কী ? সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বীরভূম সফরে এসেছিলেন ৷ তখন সাংসদ শতাব্দী রায় রাজনগরের এই সিসাল ফার্মটিকে পুনরায় খোলার দাবি পেশ করেন ৷ সাংসদ বলেন, "2009 সালে আমি যখন প্রথম সাংসদ হই তখন থেকেই দেখছি কারখানাটা বন্ধ ৷ এটা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের সময় তৈরি। যে কোনও শিল্প হোক কিন্ত নতুন করে শুরু হলে কর্মসংস্থান হবে ৷ তাই আমি এটা খোলার জন্য অনেকবার আবেদন করেছি । কিন্তু, লাভ হয়নি । নতুন সরকার এসেছে, আমি আবারও দাবি রাখছি সিসাল ফার্মটি খোলার ৷ যদি খোলা হয় বীরভূমের ভালো হবে।" কারখানার ইতিহাস বীরভূমের রাজনগরে 1961 সালের 21 জানুয়ারি সিসাল দড়ির কারখানার উদ্বোধন করেছিলেন আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের রূপকার হিসেবে খ্যাত ডঃ বিধানচন্দ্র রায় ৷ এই অঞ্চলে কমপক্ষে 3 হাজার একর জমিতে সিসাল বা কোঙা গাছের চাষ হত ৷ সেই গাছের পাতা থেকেই তন্তু নিষ্কাশিত হত। তার জন্য বিশাল বিশাল যন্ত্রাংশ বসানো হয়েছিল ৷ 20 থেকে 25টি বড় গুদামঘর ছিল ৷ সেখানে সিসাল দড়ি মজুত হত ৷ শ'য়ে শ'য়ে স্থানীয় আদিবাসীরা সিসাল দড়ি নির্মাণের কাজে যুক্ত ছিলেন ৷ এই রাজনগর সিসাল ফার্মে দড়ির বরাত আসত কলকাতা ও হলদিয়া বন্দর-সহ ভারতের বিভিন্ন সমুদ্র বন্দর থেকে। বড় বড় ট্রাক, লরি করে বীরভূমের ঝাড়খণ্ড সীমানার রাজনগর থেকে সিসাল দড়ি যেত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কারণ, এই সিসাল দড়ি এতটাই মজবুত যে উত্তাল সমুদ্রে বয়ার সঙ্গে বড় বড় জাহাজকে অনায়াসেই বেঁধে রাখা যেত ৷ আর এই দড়ি সমুদ্রের নোনা জলেও নষ্ট হয় না ৷ তাই এই সিসাল দড়ি অন্যান্য কাজের তুলনায় জাহাজ বেঁধে রাখার কাজেই বেশি ব্যবহৃত হত ৷ সঙ্কটের শুরু কবে, কেন ? আটের দশকের মাঝামাঝি থেকে ধীরে ধীরে ধুঁকতে শুরু করে এই সিসাল দড়ির কারখানা। এই মুহূর্তে একেবারেই বন্ধ ৷ জঙ্গলে ছেয়ে গিয়েছে সেই সময়ের সমস্ত নির্মাণে ৷ জরাজীর্ণ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের তৈরি সিসাল ফার্ম। ফলকটি রয়ে গিয়েছে আজও ৷ আর যেখানে সিসাল গাছ চাষ হত সেই সরকারি জমিগুলিতে পরবর্তীকালে তৈরি হয়েছে পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র । বাকি জমি বেসরকারি সংস্থাকে ইজারায় দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে এই মুহূর্তে ওই অঞ্চলে সিসাল গাছের দেখা পাওয়া বেশ কঠিন ৷ বর্তমানে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে প্রকৃতির 'ক্যানসার' প্লাস্টিক মুক্ত সমাজ গড়তে হবে ৷ আর সেখানই প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি সিসাল দড়ির কারখানা আর নেই ৷ বাজার ছেয়ে গিয়েছে নাইলনের দড়িতে ৷ এই নাইলনের দড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবেশ বান্ধব ও পচনশীল সিসাল দড়ি বর্জন করা হয়েছে। প্রাক্তন কর্মীর আক্ষেপ একদা রাজনগরের সিসাল কারখানায় কাজ করতেন বিশ্বজিৎ মণ্ডল। একরাশ আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, "নিজের হাতে সিসাল পাতা থেকে তন্তু বের করেছি। গাছ থেকে পরিণত পাতাগুলি কেটে নিয়ে যাওয়া হত ৷ মেশিন ছিল, তা দিয়ে পাতার আঁশটা সরিয়ে ফাইবার বের করা হত ৷ পরে চৌবাচ্চার জলে ধুয়ে রোদে শুকনো করা হত ৷ তা থেকে দড়ি তৈরি হত ৷ বড় বড় জাহাজকে বেঁধে রাখা যেত, এতটাই শক্ত হত এই সিসাল দড়ি ৷ চুলের মতো একটা ফাইবার হাতে করে ছিঁড়তে পারা যেত না, এতটাই শক্ত। পরে নাইলনের দড়ি উঠে যাওয়ায় এই সিসাল দড়ির চাহিদা কমে গেল ৷ আগে এই এলাকার প্রচুর মানুষ কাজ করত ৷ সব এলাকাজুড়ে সিসাল চাষ হত ৷ এখন জমিগুলি অন্যদের দিয়ে দিয়েছে সরকার।" উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপিকা দেবলিকা দালাল ইটিভি ভারতকে এই সিসাল গাছ সংক্রান্ত কয়েকটি তথ্য দিয়েছেন.. সিসাল গাছের বিবরণ ও চাষের পদ্ধতি সিসাল গাছ কী কী কাজে লাগে এই গাছ ? সিসাল গাছের গুণাগুণ বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপিকা দেবলিকা দালাল বলেন, "এই সিসাল গাছের বিজ্ঞানসম্মত নাম এভাগা সিসালানা। ক্যাকটাস গোত্রের এই গাছ ৷ আমরা যদি প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে চাই তাহলে এই গাছ খুব উপযোগী। এর তন্তু থেকে যে দড়ি হয় তা অত্যন্ত শক্ত ও পচনশীল। ফলে পরিবেশ বাঁচবে ৷ তাছাড়া, এই গাছ থেকে কার্পেট, মাদুর, স্যানিটারি প্যাড প্রভৃতি তৈরি করা যায় ৷" 1885 থেকে 1892 সাল নাগাদ এই গাছ ভারতে আসে ৷ খরা প্রবণ এলাকায় ভালো চাষ হয়। যেমন বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু জায়গায় দেখা যায় সিসাল গাছ ৷ শুধু দড়ি হয় তা নয়, প্রচুর ভেষজগুণ সম্পন্ন এই গাছ ৷ এই নিয়ে নানাভাবে গবেষণা চলছে ৷"

(0)Comments

 

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.