নবীজি (সা.)-এর অনুকরণ ও অনুসরণ হলো মুমিনের জাগতিক ও পারলৌকিক মুক্তি, জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ ও সফলতার চাবিকাঠি। জান্নাত প্রাপ্তির পূর্বশর্ত হিসেবে নবীজি (সা.)-এর অনুকরণের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআন মাজিদের সুরা নিসার ১৩ নম্বর আয়াতে বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবহমান থাকবে আর সেটিই প্রকৃত সফলতা।' মহান আল্লাহর ভালোবাসা প্রাপ্তি মহানবী (সা.)-এর পরিপূর্ণ আনুগত্য ও অনুকরণ-অনুসরণের ওপর নির্ভরশীল। সুরা আল ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, 'হে রসুল আপনি লোকেদের বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চাও তাহলে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন। তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।' একমাত্র নবীজি (সা.)-এর আনুগত্য ও অনুকরণের মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নবীজি (সা.)-এর আনুগত্য ও অনুকরণের বাইরে কোনোভাবেই আল্লাহর সন্তুষ্টি, মুক্তি বা সওয়াব অর্জন সম্ভব নয়। মুমিনের দায়িত্ব হলো জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে নবীজি (সা.)-এর অনুকরণ-অনুসরণ এবং আনুগত্য করা। জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে নবীজি (সা.)-এর শিক্ষা, বিধান ও নির্দেশ দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেওয়া। সব মানুষের কথা ও সব-মতের ঊর্ধ্বে নবীজি (সা.)-এর কথাকে স্থান দেওয়া, আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের সুরা আনফালের ১ নম্বর আয়াতে বলেছেন, 'যদি ইমানদার হয়ে থাকো তবে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের হুকুম মান্য করো।' সম্মানিত শ্রোতা এবার আমরা নবীজি (সা.)-এর অনুকরণের কিছু ক্ষেত্রবিশেষ জেনে নেব। ইবাদতের ক্ষেত্রে নবীজি (সা.)-এর অনুকরণে নামাজ, রোজা ও হজ সঠিকভাবে পালন করতে হবে। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও তাওয়াক্কুল করতে হবে, সুন্নত-নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করতে হবে। ব্যক্তিগত চরিত্র ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে নবীজি (সা.)-এর অনুকরণ সততা ও আমানতদারি রক্ষা করতে হবে। ওয়াদা রক্ষা করার সঙ্গে সঙ্গে সত্য কথা বলতে হবে। চরম ধৈর্য ও ক্ষমা প্রদর্শন করতে হবে। অহংকার ত্যাগ করে বিনয়ী হতে হবে। সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে নবীজি (সা.)-এর অনুকরণ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নম্র আচরণ ও ভালো ব্যবহার করতে হবে, প্রতিবেশী ও অতিথির হক আদায় করতে হবে, দুর্বল ও এতিমের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি দেখাতে হবে, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। লেনদেন ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে নবীজি (সা.)-এর অনুকরণ ব্যবসায় সত্যতা ওজনের সঠিক পরিমাপ করতে হবে। প্রতারণা ও সুদ বর্জন করতে হবে, আমানত রক্ষা ও চুক্তি পূরণ করতে হবে। নবীজি (সা.)-এর অনুকরণের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করাও প্রত্যেক মুমিনের একান্ত অপরিহার্য। ইবাদত বন্দেগিতে নবীজি (সা.)-এর অনুসরণ নামাজ, রোজা এবং অন্য সব ইবাদত যেভাবে নবীজি (সা.) করেছেন, সেভাবে আদায় করা। চরিত্র ও নৈতিকতার দিক দিয়ে নবীজি (সা.)-এর অনুসরণ যেমন সততা, ন্যায়পরায়ণতা, নম্রতা, ক্ষমা এবং মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ লালন করা। এ ব্যাপারে আল্লাহ পবিত্র কোরআন মাজিদে সুরা আল ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন, 'যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় আল্লাহর পথে ব্যয় করে, ক্রোধ দমন করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয় তারাই সৎকর্মশীল। আল্লাহ সৎ কর্মশীলদের ভালোবাসেন। লেনদেন ও সামাজের ক্ষেত্রে নবীজি (সা.)-এর অনুসরণ যেমন ব্যবসাবাণিজ্য পারিবারিক জীবন ও সামাজিক সম্পর্কে নবীজি (সা.)-এর সততা ও ইনসাফের নীতি মেনে চলা। নবীজি (সা.)-এর যা নিষেধ করেছেন এবং অপছন্দ করেছেন তা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা মুমিনের ইমানি দায়িত্ব। আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা হাশরের ৭ নম্বর আয়াতে বলেছেন, 'রসুল যা কিছু তোমাদের আদেশ করেছেন তা গ্রহণ করো এবং যে জিনিস থেকে তিনি তোমাদের বিরত থাকতে বলেছেন, সেটি বর্জন করো। আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।' সর্বোপরি কোনো কাজ করার আগেই ভাবতে হবে, আমি যে কাজ করছি সে কাজের মধ্যে রসুলের অনুকরণ অনুসরণ আছে কি না, যদি থাকে তবে ইহকালে ও পরকালে সফলতা আসবে ইনশাল্লাহ। আর নবীজি (সা.)-এর দেখানো পথে কোনো কাজ করলে সেটি সুন্নতের আমল হবে, সুন্নতের ওপর অটল থাকলে মানুষ গোমরাহি বা পথভ্রষ্টতা, ফিতনা-ফ্যাসাদ-বিপর্যয় থেকে নিরাপদ থাকবে।
♦ লেখক : খতিব, বাইতুন নূর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ
দক্ষিণ পীরেরবাগ, ঢাকা
(0)Comments