নিখোঁজ শিশুদের খুঁজতে অনাগ্রহ

নিখোঁজ শিশুদের খুঁজতে অনাগ্রহ
View on original source
Category: Politics
Share
Archive
Like
পুলিশ প্রশাসনে আমি নিজেও চাকরি করেছি। গত বছরের ২০ মে মঙ্গলবার আমার শিশু সন্তান তামিমকে রাজবাড়ী থেকে হারানোর পর আজও খোঁজ পাইনি। ১৬ মাস পথে পথে দৌড়াইতে দৌড়াইতে মন মানসিকতা কোন কিছুই ঠিক নাই। পুলিশের কাছে দৌড়াইছি। নিজে সাবেক সদস্য হয়েও পুলিশের কাছে তেমন সাহায্য সহযোগিতা পাইনি। প্রথম প্রথম কিছুদিন তারা ইজ্জত দিছে। কথাবার্তা ভালো বলছে। মাসখানেক পার হতেই তাদের কাছে গেলে মনে হয় যে আমি কি অন্যায় করে আসছি। তাদের কাছে কোন সম্মান পাই নাই। নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজে পেতে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে বলে আক্ষেপ করেন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য নজরুল ইসলাম। আবার ঢাকার মিরপুর-১১ এলাকা থেকে ১৩ মে নিখোঁজ হয় শিশু মোহাম্মদ ইব্রাহিম। ইব্রাহিমের বাবা জসিম পেশায় ফুচকা বিক্রেতা। তিনি বলেন, ১৩ মে আমার ছেলে ইব্রাহিম নিজ বাসা থেকে অপহৃত হয়। আমার ছেলে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে ভবনে ঢোকে। বিল্ডিং থেকে ছেলেকে আর বের হতে দেখা যায়নি সিসি ক্যামেরায়। পল্লবী থানা প্রথমে জিডি নেয় নাই। সকালে আসেন, বিকেলে আসেন করে করে জিডি নেয় ১৫ মে। জিডি করার পর ওনারা শুধু ঘুরান। এভাবে ১৭ দিন ঘুরিয়ে মামলা নিয়ে পুলিশ তদন্ত ছেড়ে দেয় ডিবির হাতে। দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু নিখোঁজ ও অপহরণের ঘটনা। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারাদেশের বিভিন্ন থানায় প্রায় ১৬ হাজার শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে দুই হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পুলিশের কাছে এসেছে। শিশু নিখোঁজের এমন পরিসংখ্যান তাদের নিরাপত্তা, পারিবারিক সচেতনতা এবং সামাজিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নিখোঁজ শিশুদের কেউ খেলাধুলার সময় পরিবারের অগোচরে হারিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার বাস বা গণপরিবহন থেকে ভুল করে নেমে গিয়ে আর পরিবারের কাছে ফিরতে পারছে না। আবার প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। এমনকি মুক্তিপণ আদায়ের পরেও মিলছে প্রিয় সন্তানের লাশ। অন্যদিকে রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোর বস্তিতে জন্ম নেয়া হাজার হাজার শিশুর জন্ম নিবন্ধন নেই। কোন খোঁজ নেই মা-বাবা বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যের। এ ধরনের শিশুদের হারিয়ে যাওয়া বা নিখোঁজের কোন পরিসংখ্যান নেই পুলিশ বা অন্য কোন সংস্থার কাছে। এ ধরনের পথ শিশু বা অভিভাবকহীন শিশুদের জন্ম নিবন্ধন করা বা তাদের সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠতে সহযোগিতা করতে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন অপরাধ ও সমাজ বিজ্ঞানীরা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিখোঁজ হওয়া অনেক শিশুকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বড় অংশ দীর্ঘদিনেও ফিরে আসছে না। নিখোঁজ শিশুদের একটি অংশ কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে তাদের খুঁজে বের করা হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন পরও কেন অনেকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না- এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে দ্রুত উদ্ধার পাওয়ার উদাহরণও রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়কে উদ্ধার অভিযানের 'গোল্ডেন আওয়ার' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিখোঁজের তথ্য যত দ্রুত পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া যায়, শিশুকে নিরাপদে উদ্ধারের সম্ভাবনাও তত বাড়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু থানায় সাধারণ ডায়েরি করার মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে নিখোঁজের পরপরই সমন্বিতভাবে তথ্য প্রচার, প্রযুক্তিনির্ভর চাইল্ড ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এবং আন্তঃথানা যোগাযোগ জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদেরও শিশুদের চলাফেরা ও নিরাপত্তার বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে। সূত্র মতে, দেশে এমন কোনো একক পূর্ণাঙ্গ এবং জাতীয় ডেটাবেস নেই, যেখান থেকে জানা যাবে প্রতি বছর কতজন শিশু নিখোঁজ হয়, কতজন অপহৃত হয়, কতজন পাচারের শিকার হয়, কতজন স্বেচ্ছায় ফিরে আসে কিংবা কতজনের লাশ পাওয়া যায়। আইন বিশেষজ্ঞ এবং শিশু সুরক্ষা সংস্থাগুলোর মতে, নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে একটি সুনির্দিষ্ট এবং সমন্বিত জাতীয় রেসপন্স সিস্টেম বা কাঠামো থাকা প্রয়োজন। শুধু নিখোঁজের মোট সংখ্যা নয়, বরং উদ্ধার হওয়া শিশুদের তথ্য এবং নিখোঁজ হওয়ার আসল কারণগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। এদিকে পুলিশ সদর সপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। তবে এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ শিশু, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ। গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী ৪৭৪ শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জন এখনো নিখোঁজ। এছাড়া, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের সংখ্যা ১৫ হাজার ২৪৩। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জন উদ্ধার হয়েছে এবং এক হাজার ৯৭০ জন এখনো নিখোঁজ। সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম ইনকিলাবকে বলেন, শিশু নিখোঁজের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। শিশু অপহরণ বা নিখোঁজের সাথে কারা জড়িত, কিভাবে নিখোঁজ বা অপহরণ করা হচ্ছে এ সব বিষয় অতিগুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। অপহরণ ও নিখোঁজের সাথে জড়িত চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় এনে রহস্য উদঘাটনে পুলিশের সাথে অন্যান্য সংস্থার সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সাথে পরিবারের সদস্যদেরও শিশুদের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ আজকের শিশুটিই আগামীর ভবিষ্যত। নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে কাজ করা আহসানিয়া মিশনের একটি বিশেষ প্রকল্পের (অধিকার ও শাসন) টিম লিডার শেখ মহব্বত হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, কখনো কখনো পুলিশের পক্ষ থেকেই ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার থেকে নিখোঁজ শিশুদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দিয়ে যান। দেখা যায় এদের মধ্যে কোনো কোনো শিশুর পরিবার কখনো কখনো দুই বছর, তিন বছর কিংবা আরো বেশি সময় পরে তাদের সন্তানদের ফিরে পায়। কোনো কোনো শিশু কখনোই তার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারে না। এজন্য সরকারের উচিৎ কোনো শিশু নিখোঁজের পর পরই ঘটনাস্থলের উল্লেখ করে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালানো। প্রয়োজনে নিখোঁজ শিশুর ছবিসহ পোষ্টারিংসহ গণমাধ্যমে প্রচার করা। প্রপারলি প্রচারণায় ৭০ ভাগেরও বেশি শিশু তার পরিবার ফিরে পাবে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী অধ্যাপক ইনকিলাবকে বলেন, অনেক শিশু অপহরণের শিকার হচ্ছে। কেউ কেউ পাচার করা হচ্ছে। অপহরণকারী চক্র কিংবা দুষ্টু চক্র অপহরণকৃত এ শিশুদের দিয়ে বিভিন্ন ধরনের অমানবিক কর্মকা- করাচ্ছে। কোনো চক্র শিশু অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে। শিশু নিখোঁজের মামলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। শিশু নিখোঁজে কেউ জড়িত থাকলে আইন অনুযায়ী তার সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে হবে। এসব ঘটনাকে কখনোই হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, শিশু নিখোঁজের বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে এবং সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখার জন্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেয়া আছে। পুলিশ উদ্ধারে তৎপরও আছে। কারও বিরুদ্ধে যদি কোনো ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করেন যে জিডি নিতে অনীহা বা অসহযোগিতা করেছে কোনো থানা, পুলিশ তাহলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে। তিনি আরও বলেন, অনেকে অনেক পারসেপশন থেকে অভিযোগ করে থাকেন। এ কারণে অনলাইন জিডির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনলাইন জিডি কিন্তু গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো বিলম্বের সুযোগ নেই। শিশু নিখোঁজের ঘটনায় পরিবারের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। জনসমাগমপূর্ণ স্থান, বাজার, মেলা, পার্ক, বাসস্ট্যান্ড কিংবা রেলস্টেশনে শিশুদের প্রতি বাড়তি নজর রাখা প্রয়োজন।

(0)Comments

 

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.