বগুড়ায় দুই কলেজে নিয়োগ বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার দুই কলেজে শিক্ষক, অশিক্ষক ও তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী বিধি-বহির্ভূতভাবে নিয়োগে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে এই নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়। ওই সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য সাহাদারা মান্নান ও তার ভাই তৎকালীন কলেজের অধ্যক্ষ সাইদুজ্জামান স্বপনের যোগসাজসে এসব টাকা নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে কলেজের গভর্নিং বডির সহযোগিতায় এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়। বর্তমানে কম প্রচারিত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে সারিয়াকান্দি ডিগ্রি কলেজে চারজন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এদিকে সারিয়াকান্দি ডিগ্রি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি এ্যাডভোকেট নূরে আলম বাবু বলছেন, পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞাপন প্রচারের বিষয়টি অধ্যক্ষের কাজ। নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ না হতেই নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়টি ঠিক না।
সঠিক তদারকির মাধ্যমে যোগ্যব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হবে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সারিয়াকান্দি উপজেলার দুই কলেজে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যে কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষারমান ঝিমিয়ে পড়েছে। মূলত গভর্নিং বডির সভাপতি, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং কলেজের দুর্নীতিপরায়ণ অধ্যক্ষদের যোগসাজশে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে এই বিশাল অঙ্কের অবৈধ আর্থিক লেনদেন বা বাণিজ্যের ঘটনাগুলো ঘটেছে। জানা যায়, সারিয়াকান্দি ডিগ্রি কলেজ ও সারিয়াকান্দি আব্দুল মান্নান সরকারি মহিলা কলেজে বিধি-বহির্ভূতভাবে এবং গোপনে শিক্ষকসহ অন্যান্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তৎতকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এসব নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়। সারিয়াকান্দি ডিগ্রি কলেজ একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এটি স্থাপিত হয় ১৯৭০ সালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কলেজটি সুনামের সাথে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলো।
কিন্তু ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে কলেজে দুর্নীতি ও অনিয়ম দেখা দেয়। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিধি-বহির্ভূতভাবে ৩৩জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১১জন। যাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে মোটা অংকের টাকা। ওই সময় কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনের সংসদ সদস্য সাহাদারা মান্নান এর ভাই সাইদুজ্জামান স্বপন। সংসদ সদস্য, দায়িত্ব থাকা অধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির যোগসাজসে প্রায় ৩ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠে এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নিয়োগ বাণিজ্যেসহ কয়েকটি মামলায় তৎকালীন অধ্যক্ষ সাইদুজ্জামান স্বপন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। কলেজটি বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া কলেজটিতে শিক্ষক পদে কর্মরত ৩৮পদ থাকলে ২টি শূণ্য পদ রয়েছে। ৪জন প্রদর্শক এর পদে ১জন কর্মরত আছেন। শূণ্য পদ রয়েছে ৩টি। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ১৮জনের স্থলে ১৪জন কর্মরত আছেন। শূণ্য পদ রয়েছে ৪টি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ বাণিজ্যে নানা অভিযোগ থাকলেও সেটি আমলে না নিয়ে আবারও নিয়োগ বাণিজ্যের পাঁয়তারা করছে বর্তমান গভর্র্নিং বডি।
পাঠকের কাছে যায় না এমন পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। যাতে অন্যরা আবেদন করতে না পারেন। তাদের বিরুদ্ধে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী পদে ৪জনের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যেটি স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে সমালোচনার ঝড় তুলেছে। এদিকে একইভাবে সারিয়াকান্দি আব্দুল মান্নান সরকারি মহিলা কলেজ নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়েছে। এই কলেজটি স্থাপনের পর ২০১০ সালে মুন্জুরী পায়। এরপর ২০১৩ সালে এমপিও ভূক্ত করা হয়। জোরকরে ৬ বছরের ব্যবধানে ২০১৮ সালে কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়। অথচ এই উপজেলায় ঐতিহ্যবাহি সারিয়াকান্দি ডিগ্র কলেজ ও চন্দনবাইশা ডিগ্রি কলেজ থাকার পরও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সারিয়াকান্দি আব্দুল মান্নান সরকারি মহিলা কলেজ সরকারিকরণ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারিকরণের কয়েক মাস আগে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ বাণিজ্যের মতো বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে।
তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এই নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়েছে তৎতকালীন অধ্যক্ষ শাহ আলম, গভর্নিং বডি ও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজসে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এসব গভর্নিং বডির নেতৃবৃন্দ গা ঢাকা দিয়েছেন। সারিয়াকান্দি ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান জানান, আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে দুর্নীতি হয়েছে বিষয়টি শুনেছি। তবে সঠিত তথ্য আমার কাছে নেই। তৎকালীন অধ্যক্ষ সাইদুজ্জামান স্বপনের বোন এমপি ছিলেন। সেক্ষেত্রে নিয়োগ বাণিজ্য হওয়াটা স্বাভাবিক। গভর্নিং বডির সদস্যদের সাথে আলোচনা করে পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। আমার একক সিদ্ধান্তে কিছু হয়নি।
(0)Comments