মাছের খামারে জাল; মরছে পাখি, বন্য জন্তু, মরছে উপকারী গুইসাপ

মাছের খামারে জাল; মরছে পাখি, বন্য জন্তু, মরছে উপকারী গুইসাপ
View on original source
Category: SciTech
Share
Archive
Like
পৃথিবীজুড়ে দ্রুত কমে আসছে বন্য প্রাণীর সংখ্যা। এর কারণ কী? সোজা কথায়, যেদিক দিয়েই মানুষের বিস্তার ঘটেছে, ধ্বংস হয়েছে 'ওয়াইল্ড লাইফ'। যুগের পর যুগ ধরে মানুষ নিজেদের অস্তিত্বকে পাকাপোক্ত করতে কিংবা নিজেদের সুবিধা আদায়ের লক্ষে এমন সব পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, যাতে নির্বিচারে মারা পড়েছে বন্য প্রাণী। চলতি বছরের গত ২১ আগস্ট বিকেলে শিবপুর থানার দুলালপুর ইউনিয়নের মানিকদি গ্রামের যুবক রিফাত হোসেন আমাকে ফোন করে। জানতে পারি, তাদের গ্রামের একটি পুকুরে বেশ কয়েক দিন ধরে একটি বড় আকৃতির গুইসাপ জালে আটকা পড়ে আছে। সে আমাকে অনুরোধ করে, যাতে আমরা সেখানে গিয়ে প্রাণীটিকে উদ্ধার করে যন্ত্রণার হাত থেকে রক্ষা করি। আধুনিক সময়ের এই যুবকের বন্য প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা আমার ভালো লাগল। সবাই এমন হলে প্রতিটা বন্য প্রাণীর জীবন হতো নিরাপদ, পৃথিবী বদলে যেত। পরদিন সকালে শিবপুর থানার ওপর দিয়ে যখন বাইক চালিয়ে যাচ্ছিলাম বিপদগ্রস্ত গুইসাপটিকে উদ্ধার করার জন্য, তখন একটা বিশেষ বিষয় নজর কেড়ে নিল। এই জায়গাটাতে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হয়, বোঝা যায়। তাই প্রতিটি জলাশয় নাইলনের চিকন জাল দিয়ে ঘেরা। শুধু তা-ই নয়, ওপরেও শামিয়ানার মতো জাল বিছানো। অর্থাৎ নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা, কোনো পাখি বা বন্য জন্তু যাতে পুকুর থেকে মাছ খেতে না পারে। বিশেষ করে দুলালপুর ইউনিয়ন অতিক্রম করার সময় সবচেয়ে বেশি জালের বিস্তার চোখে পড়ল। এই জাল পাখি আর বন্য জন্তুর জন্য অভিশাপসম। এখানকার মানুষজন শুধু বন্য প্রাণীদের প্রকৃতি থেকে খাদ্য গ্রহণের অধিকারই কেড়ে নেয়নি, বাধাগ্রস্ত করে রেখেছে চলাচলের পথ; যা একটি অতি অন্যায় কাজ। আমরা মানিকদি গ্রামের সেই পুকুরপাড়ে পৌঁছে সংবাদদাতা রিফাত হোসেনের দেখা পেলাম। আরও কিছু উৎসুক মানুষ এসে হাজির হয়েছে গুইসাপ উদ্ধার দেখতে। তারা সকলেই আমাদের বলল, গুইসাপটা প্রায় ১০ দিন ধরে জালে আটকে আছে। বিষয়টা খুবই মর্ম বেদনাময়। সরীসৃপরা না খেয়ে অনেক দিন থাকতে পারে, এখানে অন্য কোনো প্রাণী হলে মরে ভূত হয়ে যেত এত দিনে। আমি প্রথমেই পুকুর মালিকের খোঁজ নিলাম, তার নাম মুকুল মিয়া, কিন্তু লোকটিকে পাওয়া গেল না। জালে আটকে থাকা গুইসাপ উদ্ধারের মূল দায়িত্বটি আসলে তার। জালে আটকে থাকা গুইসাপের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলাম সে আকৃতিতে বেশ বড়। পুকুরের ওপরে টানিয়ে রাখা জাল একদিকে পানিতে হেলে পড়েছে, সাঁতার কাটতে গিয়ে ওখানেই আটকেছে গুইসাপটা। কোনো পুকুরমালিক যদি জানত, গুইসাপ তার পুকুরের কতটা উপকার করে, তাহলে নিজেরাই তার যত্ন নিত। গুইসাপকে যদি দেশের বন্য প্রাণীর মধ্যে পরিবেশের সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন বলা হয়, তাহলে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। সে হচ্ছে পরিবেশের পরিষ্কারক। কারণ, জীবজন্তুর মৃতদেহ তার প্রধান খাদ্য। এ ছাড়া তাকে বলা হয় মানুষের পরোক্ষ নিরাপত্তাপ্রহরী; কারণ, সে সাপের ডিম ভক্ষণ করে প্রকৃতিতে বিষধর সাপের সংখ্যা কমিয়ে রাখে। এবার আসা যাক মাছের খামারের জন্য সে কী ধরনের উপকার করে থাকে? কালো গুই বা বেঙ্গল মনিটর লিজার্ড খুব ভালো সাঁতারু, এটা ঠিক আছে। তবে জলের নিচে স্বাভাবিক মাছ শিকারে ততটা দক্ষ নয়। তবে রোগাক্রান্ত এবং মৃত মাছ তার প্রিয় খাদ্য। আর এই কাজটা করে সে মাছের খামারে রোগের সংক্রমণ রোধ করে থাকে। এর চেয়ে বড় উপকার আর কী হতে পারে? আমরা দ্রুত প্রাণীটাকে উদ্ধারে মন দিলাম। আসলে পাড় থেকে অনেকটা দূরে সে আটকে আছে। তবে এখানে একটি অদ্ভুত জলযান পাওয়া গেল, চারটি খালি ড্রামের ওপর কয়েকটি তক্তা বিছিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে সমস্ত পুকুরে নিয়মিত খাবার দেওয়া হয়। আমি আর মাসুদ সেই অদ্ভুত জলযানে উঠে বসলাম। তারপর জালের শামিয়ানার নিচ দিয়ে লগি ঠেলে একেবারে গুইসাপের কাছে পৌঁছে গেলাম। প্রথমে তাকে তক্তার পাঠাতনের ওপর উঠিয়ে রাখলাম। তারপর আমি ঘাড় আর লেজের গোড়া চেপে ধরতেই মাসুদ ছুরি-কাঁচি নিয়ে কাজে নেমে গেল। তাকে জালমুক্ত করতে আমাদের খুব বেশি সময় লাগল না। একটা বিষয় দেখে খুবই খারাপ লাগল, তার ডান হাতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝুলে ছিল জালে। আসলে সাপ, গুইসাপ, কুমিরসহ অন্যান্য সরীসৃপ কোথাও আটকে গেলে বাঁচার জন্য নিজের দেহটাকে প্রবল বেগে ঘোরাতে শুরু করে। গুইসাপও ঠিক তা-ই করেছিল। তাতে ভয়ানকভাবে আহত হয় তার ডান হাত, পাশাপাশি দেহ আরও গভীরভাবে জড়িয়ে যায় জালে। আমরা তাকে পুকুরের কিনারায় এনে ছেড়ে দেওয়ার পর ঘটলো আরেক ঘটনা, পুকুরের চারদিক ঘিরে রাখা জালে আটকা পড়ল সে। তাকে জাল থেকে মুক্ত করে কিছুটা দূরে নিয়ে ছেড়ে দিলাম। তিন থাবায় ভর করে একটা ঝোপের ভেতর চলে গেল। এই প্রাণীটা বলতে গেলে এখনো বেশ আহত হবে, নিবিড় পর্যবেক্ষণে তার চিকিৎসার দরকার ছিল। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, গুইসাপ আহত হলে সুস্থ হতে অনেক সময় লাগে। কখনো ক্ষতে পচন ধরে এদের মৃত্যু ঘটে। আসলে এখানে আমাদের আর করার কিছু নেই, তাই প্রকৃতির হাতেই তাকে সমর্পণ করতে হলো। দুঃখের বিষয় শুধু শিবপুর নয়। খামারের মাছ রক্ষার নামে দেশের অনেক স্থানে নাইলনের চিকন সুতার জাল ব্যবহৃত হচ্ছে। চারপাশে এবং ওপরে পেতে রাখা এসব জালে প্রতিনিয়ত আটকা পড়েছে পাখি এবং বন্য জন্তু। ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ওরা। বিষয়টা একদিক দিয়ে যেমন নির্মম, তেমনি দেশের প্রাণিবৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রতিটি বন্য প্রাণীর নিজস্ব আবাসস্থলে স্বাধীন বিচরণের অধিকার রয়েছে, মুক্ত আকাশে ঘুরে খাবার সংগ্রহ করা প্রতিটি পাখির অধিকার। এই অধিকারে যারা বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তারা প্রত্যেকেই প্রকৃতির শত্রু। বাংলাদেশ সরকারের নবগঠিত ওয়াইল্ড লাইফ কমিশনের কাছে বিষয়টা গুরুত্বসহকারে দেখার জন্য অনুরোধ রইল।

(0)Comments

 

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.