রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ইউক্রেনের সামরিক ক্রয়খাতে ব্যাপক দুর্নীতি, অপচয় এবং অব্যবস্থাপনার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে গোপন সামরিক অডিটে। ইউক্রেনীয় স্টেট অডিট সার্ভিস এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ অডিট বিভাগের ৭০০ পৃষ্ঠারও বেশি আর্থিক নথিপত্র পর্যালোচনা করে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই গোপন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চরম এই সংকটকালেও কীভাবে ইউক্রেনীয় সামরিক ক্রয়ে বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে। গোপন অডিট রিপোর্টে উঠে আসা প্রধান ৪টি তথ্য:
১. অস্বাভাবিক মূল্যে অস্ত্র ক্রয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য: যেখানে দেশটির সাধারণ মানুষ ও রেস্তোরাঁগুলো সেনাবাহিনীর ফান্ডে ছোট ছোট অনুদান দিয়ে সহায়তা করছে, সেখানে সামরিক ক্রয় কর্মকর্তারা অস্ত্রের জন্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করেছেন। সরাসরি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কম দামে কেনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সিংহভাগ চুক্তি করা হয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী বা ট্রেডারদের মাধ্যমে, যারা অন্তত ৩ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ যোগ করে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে রকেট কেনার ক্ষেত্রে সরাসরি উৎপাদকের কাছ থেকে সস্তা অফার থাকা সত্ত্বেও একটি চেক (ঈুবপয) মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উচ্চমূল্যে চুক্তি করা হয়।
২. ব্যর্থ ও দুর্নীতির অভিযুক্তদের বারবার কাজ প্রদান: প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ১০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭টি প্রতিষ্ঠানই পূর্বে চুক্তি অনুযায়ী কাজ দিতে ব্যর্থ হয়েছে অথবা তাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলছে। এমনকি দুর্নীতির মামলায় জামিনে মুক্ত থাকা অবস্থায়ও ঠিকাদারদের নতুন কাজ দেওয়া হয়েছে। যে ১৮টি প্রতিষ্ঠান অতীতে কাজ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছিল, তাদের কাজ দেওয়া অব্যাহত রাখা হয়। এর মধ্যে ৬টি প্রতিষ্ঠান পূর্বে একটি চুক্তিও পূরণ করতে পারেনি। একটি উদাহরণে দেখা যায়, ৬০০টি বিশেষায়িত ড্রোন সরবরাহে ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও একটি সংস্থাকে নতুন করে ১,৯৫০টি ড্রোনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়, যার মধ্যে মাত্র ৫০টি তারা নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করতে পেরেছিল।
৩. সক্ষমতার প্রমাণ ছাড়াই চুক্তি ও ত্রুটিপূর্ণ গোলাবারুদ: তুর্কি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় পরিমাণ রকেট সরবরাহ করতে পারবে না বলে সতর্ক করার পরও ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ক্রয় সংস্থা একটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৭০ মিমি গাইডবিহীন এভিয়েশন রকেট কেনার চুক্তি করে। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলোÑপরীক্ষা ছাড়াই এসব অস্ত্র কেনা হয়েছিল। একটি যুদ্ধ অভিযান চলাকালে ইউক্রেনীয় এমআই-৮ হেলিকপ্টারের লঞ্চ টিউবেই একটি রকেট বিস্ফোরিত হয়ে সামরিক বিমানটির মারাত্মক ক্ষতি করে, যা নিয়ে পরবর্তীতে তদন্ত শুরু হয়।
৪. একদিকে অস্ত্রের কারবারিদের পকেট ভারী, অন্যদিকে সরকারি তহবিলের ক্ষতি: যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে এবং ইউক্রেনের ভেতরের অস্ত্র ঠিকাদাররা বিপুল মুনাফা লুটে নিয়েছে। 'চেকোস্লোভাক গ্রুপ' সহ বেশ কিছু ইউরোপীয় ও মার্কিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউক্রেনে বিক্রির মাধ্যমে তাদের আয় কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। এমনকি লোকসানে থাকা ইউক্রেনীয় বিস্ফোরক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান 'পাভলোহ্রাদ কেমিক্যাল প্ল্যান্ট' সামরিক বাহিনীর কাছে বিক্রির মাধ্যমে বিপুল লাভে ফিরে এসেছে। অন্যদিকে, অডিটরদের হিসেব অনুযায়ী কেবল ২০২৪ সালেই প্রতারণা, অপচয় ও অব্যবস্থাপনার কারণে ইউক্রেন সরকারের প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার (১২০ কোটি ডলার) ক্ষতি হয়েছে। সংস্থার প্রাক্তন উপদেষ্টা তামারলান ওয়াহাবোভ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এসব অতিরিক্ত খরচ ও অপচয়ের ফলে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ অর্ডারের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকছে না, যা যুদ্ধে তাদের সক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস।
(0)Comments