সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার আইনগত, কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পুলিশি পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বেনজীর আহমেদের বর্তমান অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং দেশে-বিদেশে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ শনাক্ত ও আইনানুগভাবে জব্দ করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে সরকারি দল ও বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদে মতবিরোধ, বিতর্ক ও বহুমত থাকবে। তবে 'ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের' প্রশ্ন এলে তার প্রতিরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমের ১৪৭ বিধিতে উত্থাপিত সাধারণ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিদেশে পলাতক আসামিদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় হত্যা মামলায় অভিযুক্ত, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত ও ইন্টারপোল রেড নোটিশভুক্ত মোহাম্মদ আরিফ সরকারকে গত ৬ মে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এবং মোবারক মণ্ডলকে ২৭ মে কাতার থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, কুমিল্লার আলোচিত তনু হত্যা মামলার পলাতক অভিযুক্ত মো. জাহিদুজ্জামান ও মো. শাহিন আলমকে আন্তর্জাতিকভাবে শনাক্ত এবং তাদের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি ঢাকা ও ইন্টারপোলের উদ্যোগে তাদের বিরুদ্ধে পৃথক রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে। তাদের অবস্থান শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এসব কার্যক্রম প্রমাণ করে যে বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার ইন্টারপোল, সংশ্লিষ্ট বিদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বেনজীর আহমেদসহ বিদেশে অবস্থানরত কোনো পলাতক আসামিকে আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকার কোনো ধরনের শৈথিল্য প্রদর্শন করবে না জানিয়ে তিনি বলেন, তার বর্তমান অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, কথিত একাধিক পাসপোর্টের অভিযোগ যাচাই এবং দেশে-বিদেশে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ শনাক্ত ও আইনানুগভাবে জব্দ করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার আইনের শাসন, যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যাচাইহীন তথ্যের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য ও আনুষ্ঠানিক তথ্যের ভিত্তিতে, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভাব্য সব আইনগত, কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পুলিশি পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
শুধু গিয়ে কাউকে ধরে আনা যায় না
বেনজীর আহমেদকে ইউএই থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে মীর আহমাদ বিন কাসেমের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়ে কাউকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়; এর জন্য আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে। ইউএই থেকে আসামি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক আইনি সহায়তা বা মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সের (এমএলএ) প্রক্রিয়া রয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সব বিষয়ে দুবাই ছুটে গেলে হয় না, লিগ্যাল প্রসিডিউর আছে।
তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে দুবাই সফর করেছেন এবং সেখানে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টির গুরুত্বও তাদের বোঝানো হয়েছে। ইউএই কর্তৃপক্ষ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রত্যর্পণের বিষয়ে কাজ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আইনের হাত যেমন লম্বা, বিচারিক প্রক্রিয়াও লম্বা
বিদেশে পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা কাউকে ধরে-বেঁধে ফাঁসি দিতে পারি না। একজন অপরাধী যত বড় অপরাধীই হোক, তাকে জুডিশিয়াল প্রসেসের মধ্য দিয়ে নিতে হবে এবং আদালতের রায় অনুসারে সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, এই জুডিশিয়াল প্রসেসটা একটু লম্বা হয়। আইনের হাত যেমন লম্বা, জুডিশিয়াল প্রসেসটাও অনেক লম্বা। সুতরাং আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে এবং জুডিশিয়াল প্রসেসের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে।
গুম ও মানবাধিকার আইন নিয়েও জবাব
সংসদে গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকারসংক্রান্ত আইন নিয়ে বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট আইনগুলো নিয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি ও সংশোধনী দিতে পারতেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় তারা ওয়াকআউট করেছেন।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আগের অধ্যাদেশের তুলনায় বর্তমান আইনে ভুক্তভোগীর সরাসরি আদালত ও আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ থেকে 'এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স' শব্দটি চিরতরে মুছে ফেলা ছিল সরকারের প্রতিশ্রুতি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রত্যাশা এবং জাতির প্রত্যাশা অনুযায়ী সরকার এ বিষয়ে আইন করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের পলাতক আসামি ও নেতাকর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় মিছিল করছে— এমন বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিতর্ক না বাড়িয়ে মূল বিষয়ে থাকতে চাই।
পরে তিনি বলেন, সরকারি দল, বিরোধী দল— সবাই মিলে আমাদের একটাই অঙ্গীকার হবে, প্রতিশ্রুতি হবে। আমরা এখানেই বিতর্ক করব, তর্ক করব, দ্বিমত হব, বহুমত হব। কিন্তু ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের প্রশ্ন যেখানেই আসবে, তার প্রতিরোধের জন্য আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের যে প্রত্যাশা, গণতন্ত্রের পক্ষে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যে দৃঢ় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেই ঐক্যকে শক্তিতে পরিণত করে গণতন্ত্রের ঝান্ডাকে আমরা ঊর্ধ্বে তুলে ধরব।
এর আগে বক্তব্যের একপর্যায়ে বিরোধী দলের নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'বিষয়ের ওপরে থাকেন।' এ সময় সংসদে দীর্ঘ আলোচনা নিয়ে হাস্যরসও হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি দ্রুত বক্তব্য শেষ করবেন।
বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আবারও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, তদন্তকারী সংস্থা, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন, ইন্টারপোল ও বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় অব্যাহত থাকবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার স্বার্থে সংরক্ষণযোগ্য তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রেখেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য সব আইনগত, কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এমএসআই/এসএএস
(0)Comments