মিরসরাইয়ের বুক চিরে চলে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে ছুটে যায় একের পর এক ট্রেন। অথচ রেলপথের পাশেই বসবাস করা মানুষের বড় অংশের কাছে ট্রেন যেন অধরাই। উপজেলার পাঁচটি রেলস্টেশনের মধ্যে চারটিই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। চালু থাকা চিনকি আস্তানা স্টেশনেও নেই কোনো আন্তঃনগর ট্রেনের নিয়মিত যাত্রাবিরতি।
শিল্প, অর্থনীতি ও পর্যটনে দ্রুত বদলে যাচ্ছে মিরসরাই। দেশের অন্যতম বৃহৎ জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে বাড়ছে বিনিয়োগ, শিল্পকারখানা ও কর্মসংস্থান। খৈয়াছড়া, মহামায়া, বাওয়াছড়া, সহস্রধারা ও রূপসী ঝরনাসহ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও প্রতিদিন বাড়ছে মানুষের আনাগোনা। শিল্পকারখানার শ্রমিক-কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও পর্যটক—বাড়ছে সব শ্রেণির মানুষের যাতায়াত।
কিন্তু মানুষের এই বাড়তি চাপের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি রেলসেবা। একদিকে কুমিরা, অন্যদিকে ফেনী—দুই পাশেই বিভিন্ন ট্রেনের যাত্রাবিরতি রয়েছে। মাঝখানে শিল্প ও জনবহুল মিরসরাইয়ে নেই আন্তঃনগর ট্রেনের নিয়মিত যাত্রাবিরতি। ফলে রেললাইন থাকার পরও রেলসেবায় দীর্ঘদিনের বঞ্চনা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
রেলওয়ে-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মিরসরাই উপজেলায় চিনকি আস্তানা, নিজামপুর, বড়তাকিয়া, মিরসরাই ও মস্তাননগর—এই পাঁচটি রেলস্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে চিনকি আস্তানা ছাড়া বাকি চারটি স্টেশন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ।
চিনকি আস্তানা স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমানে এ স্টেশনে দুটি লোকাল/মেইল সার্ভিসের যাত্রাবিরতি রয়েছে। তবে কোনো আন্তঃনগর ট্রেন নিয়মিত থামে না। একসময় আন্তঃনগরসহ বিভিন্ন ট্রেনের যাত্রাবিরতি থাকলেও ধীরে ধীরে তা বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রায় দুই দশক আগেও মিরসরাইয়ের রেলস্টেশনগুলো ছিল ব্যস্ত ও প্রাণবন্ত। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফেনী, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতে ট্রেন ছিল সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান ভরসা। বিভিন্ন ট্রেনের যাত্রাবিরতি বন্ধ হওয়ার পর ধীরে ধীরে স্টেশনগুলোও অচল হয়ে পড়ে।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় কোনো কোনো স্টেশন ভবন ও স্থাপনা জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। অরক্ষিত অবস্থায় রেলওয়ের জমি ও স্থাপনা বেদখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিত্যক্ত কিছু স্থাপনা মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।
৭০ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, '২০ বছর আগেও স্টেশনগুলোতে মানুষের কোলাহল ছিল। দূর-দূরান্তে যাতায়াতে মানুষ ট্রেনের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করত। স্টেশনগুলো আবার চালু হলে মিরসরাইয়ের রেলপথও প্রাণ ফিরে পাবে।'
মিরসরাই তালবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা নিজাম উদ্দীন বলেন, 'মিরসরাই থেকে চট্টগ্রাম যেতে বাসভাড়া ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা। ঢাকায় যেতে লাগে প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। ট্রেন চালু হলে তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াত করা সম্ভব হবে।'
তিনি বলেন, 'চট্টগ্রাম যেতে প্রায় ৩০ টাকা এবং ঢাকা যেতে প্রায় ৭৫ টাকার মতো ভাড়া হলে সাধারণ মানুষের অনেক সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে সড়কে যানবাহনের চাপ ও দুর্ঘটনাও কমবে। স্টেশন চালু হলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও বাড়বে।'
স্থানীয়দের দাবি, শুরুতে অন্তত সকাল ও বিকেলে মিরসরাই থেকে কমিউটার বা লোকাল ট্রেন চালু করা হোক। সকালে ট্রেন থাকলে চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থীরা সহজে চট্টগ্রামে যেতে পারবেন। আর বিকেলে ফিরতি ট্রেন থাকলে অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শেষে স্বল্প খরচে বাড়ি ফিরতে পারবেন তারা।
শিল্পাঞ্চলের বিস্তারের সঙ্গে রেল যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তাও এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে বাড়ছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ।
বেপজার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিরসরাইয়ের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ছয়টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় চার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। একই সময়ে ৪৮টি প্রতিষ্ঠান ভূমি ইজারা চুক্তি করেছে। এসব চুক্তির আওতায় প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের পরিমাণ ১ দশমিক ০৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থান প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার।
বেজা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভারত, সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগে ১৭টি কারখানা চালু হয়েছে। এসব কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষের। নির্মাণাধীন রয়েছে আরও প্রায় ২৪টি কারখানা। ২০৩০ সালের মধ্যে এখানে বিনিয়োগ ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
শিল্পকারখানা বাড়ার সঙ্গে শ্রমিক, কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, ঠিকাদার, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের দৈনিক যাতায়াতও বাড়ছে। ফলে শিল্পাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি কর্মরত মানুষের যাতায়াতের জন্যও রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের দাবি জোরালো হচ্ছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাবেক কনসালটেন্ট আবদুল কাদের বলেন, জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল পর্যন্ত রেল যোগাযোগ চালুর পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত। এতে শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ও ঢাকার পণ্য পরিবহন সহজ হবে। পাশাপাশি শ্রমিক ও কর্মকর্তারা কম সময়ে ও কম খরচে যাতায়াত করতে পারবেন।
তিনি বলেন, 'বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কাজ করছেন। আগামী কয়েক বছরে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। পুরো অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হবেন। তার আগেই রেলসেবা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।'
জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের ঠিকাদার গিয়াস উদ্দিন বলেন, 'শিল্পাঞ্চলে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তারা এখানে আসেন। এত বড় শিল্পাঞ্চলের পাশে কার্যকর রেলস্টেশন ও নিয়মিত ট্রেনসেবা থাকা জরুরি।'
শুধু কমিউটার ট্রেন নয়, মিরসরাইয়ের উপযুক্ত কোনো স্টেশনে আন্তঃনগর ও পর্যটন ট্রেনের যাত্রাবিরতির দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, যাত্রী চাহিদা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করে বিজয় এক্সপ্রেস, মহানগর এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতী, উদয়ন, পাহাড়িকা, সুবর্ণ এক্সপ্রেস, সোনার বাংলা এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেসের মতো উপযুক্ত ট্রেনগুলোর কয়েকটির যাত্রাবিরতি দেওয়া যেতে পারে।
বিশেষ করে চিনকি আস্তানা স্টেশনে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করে আন্তঃনগর ট্রেন থামানোর বিষয়টি বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। শিল্পের পাশাপাশি পর্যটনেও মিরসরাইয়ের পরিচিতি দ্রুত বাড়ছে। খৈয়াছড়া, রূপসী, সহস্রধারা, মহামায়াসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে সারা বছরই পর্যটকের আনাগোনা থাকে। ছুটির দিনে এসব এলাকায় বাড়ে মানুষের চাপ।
আরশিনগর ফিউচার পার্কের মালিক জামাল উদ্দিন বলেন, 'মিরসরাই এখন পর্যটনের জন্য সারাদেশে পরিচিত। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটক আসছেন। আন্তঃনগর ও পর্যটন ট্রেন চালু হলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে। রেলে যাত্রী বাড়লে সরকারের এ খাতও লাভবান হবে।'
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার বলেন, 'মিরসরাই উপজেলার মধ্য দিয়ে রেললাইন সারাদেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। অথচ চট্টগ্রাম জেলার প্রবেশদ্বার, দেশের বৃহৎ জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল, ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত গুরুত্বপূর্ণ এই উপজেলায় আন্তঃনগর রেলের যাত্রাবিরতি নেই। যাত্রীসেবার ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও নেই।'
তিনি বলেন, 'মিরসরাইয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস। শিল্প, অর্থনীতি, জনসংখ্যা ও যোগাযোগ—সব দিক থেকেই এ উপজেলা গুরুত্বপূর্ণ। মিরসরাইয়ে আন্তঃনগর ও পর্যটন ট্রেনের যাত্রাবিরতি বা সেবা চালুর বিষয়ে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।'
মিরসরাইয়ের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন বলেন, 'মিরসরাই একটি বিশাল উপজেলা। এখানে দেশের অর্থনীতির বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। পর্যটন, কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত। এই মুহূর্তে মিরসরাইয়ের রেলস্টেশনগুলো চালু করার জোর দাবি জানাচ্ছি।'
তিনি বলেন, 'রেলসেবা চালু হলে সড়কে গাড়ির চাপ কমবে, মানুষের যাতায়াত ব্যয় সাশ্রয় হবে এবং দুর্ঘটনাও কমে যাবে।'
বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আসিফ খান চৌধুরী বলেন, 'মিরসরাই ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে জনসংখ্যার দিক থেকেও মিরসরাই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আন্তঃনগর ট্রেনসেবা কেন নেই, আশা করি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সমীক্ষা করে দেখবেন।'
এইচএসএস
(0)Comments