ইরানের ‘কাসেম বাসির' যে কারণে মার্কিন নৌবহরের ‘মাথাব্যথা'

ইরানের ‘কাসেম বাসির' যে কারণে মার্কিন নৌবহরের ‘মাথাব্যথা'
View on original source
Category: Politics
Share
Archive
Like
পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের নতুন সমীকরণে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র 'কাসেম বাসির'। ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রকে জাহাজবিধ্বংসী ভূমিকায় ব্যবহারের দাবি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠছে—ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে? সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানি বাহিনী একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে বলে জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম। মার্কিন পক্ষের দাবি, দুই যুদ্ধজাহাজই ক্ষেপণাস্ত্র এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি। তবে এর পরই ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজের ওপর দিয়ে প্রথমবারের মতো নতুন অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে ইরান। তাঁর ভাষায়, ক্ষেপণাস্ত্রটি মার্কিনদের জন্য 'নরক' তৈরি করেছিল এবং তারা সরে যেতে বাধ্য হয়। এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। ইরানের পক্ষ থেকে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার দাবি করা হলেও মার্কিন সামরিক বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্রটির মডেল প্রকাশ করেনি। ফলে রেজায়ির বর্ণিত অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্রটি কাসেম বাসিরই ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এপি-ও জানিয়েছে, নতুন প্রতিবেদনে বর্ণিত কাসেম বাসির এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে পরীক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্রটি একই কি না, তা পরিষ্কার নয়। কাসেম বাসির অবশ্য নতুন কোনো নাম নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে ইরান ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রকাশ্যে আনে। সে সময় এর পাল্লা কমপক্ষে ১,২০০ কিলোমিটার এবং উন্নত নির্দেশনা ব্যবস্থার কথা জানানো হয়েছিল। কঠিন জ্বালানি ব্যবহারের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। কাসেম বাসিরের সম্ভাব্য গুরুত্ব শুধু এর পাল্লায় নয়। ইরানের দাবি অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটিতে উন্নত নির্দেশনা ব্যবস্থা রয়েছে এবং জিপিএসের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে। এর সঙ্গে যদি চূড়ান্ত পর্যায়ে গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা যুক্ত থাকে, তাহলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এটি বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কারণ চলমান একটি বিমানবাহী রণতরী স্থির কোনো স্থাপনার মতো একই জায়গায় থাকে না; ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর সেটি অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। অর্থাৎ শুধু ক্ষেপণাস্ত্রকে নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে দেওয়া যথেষ্ট নয়। লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা, তার গতিবিধি অনুসরণ করা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সঠিকভাবে আঘাত হানাই অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সবচেয়ে কঠিন অংশ। তবে কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে 'অপ্রতিরোধ্য' হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপে একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকে। এর মধ্যে রয়েছে দূরপাল্লার রাডার, এজিস-সজ্জিত ডেস্ট্রয়ার, বিভিন্ন ধরনের ইন্টারসেপ্টর, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, ডিকয় এবং আকাশপথে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা। সাম্প্রতিক ঘটনাতেও মার্কিন সেন্টকম জানিয়েছে, তাদের বিমানবাহী রণতরী ও ডেস্ট্রয়ার ইরানের ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তাই কাসেম বাসিরের মতো কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি মানেই মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের সাফল্য শুধু শত্রুর জাহাজে সরাসরি আঘাত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যদি কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে ইরানের উপকূল থেকে আরও দূরে অবস্থান নিতে হয়, তাহলে সেটিও ইরানের জন্য কৌশলগত সাফল্য হতে পারে। রণতরী দূরে সরে গেলে সেখান থেকে যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্য এলাকায় পৌঁছাতে বেশি সময় ও জ্বালানি ব্যয় করতে হবে। বাড়তে পারে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যান্য সহায়ক বিমানের ওপর চাপও। এ ধরনের কৌশলকে সামরিক ভাষায় অ্যান্টি-অ্যাকসেস/এরিয়া ডিনায়াল বা A2/AD বলা হয়—অর্থাৎ সরাসরি শত্রুর বড় অস্ত্র ধ্বংস না করেও কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় তার সামরিক কার্যক্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল করে তোলা। ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে কাসেম বাসিরকে একক অস্ত্র হিসেবে নয়, বরং ড্রোন, অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, অন্যান্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের নৌযানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা। একই সময়ে বিভিন্ন দিক, গতি ও উচ্চতা থেকে একাধিক ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হলে একটি যুদ্ধজাহাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়ে যেতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব হলেও বিপুলসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখার প্রয়োজন হতে পারে। ইরানের সাম্প্রতিক দাবি নিঃসন্দেহে মার্কিন নৌবহরের জন্য নতুন একটি সামরিক বার্তা বহন করছে। কিন্তু কাসেম বাসির মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে লক্ষ্য করে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং সেটি রণতরীকে সরে যেতে বাধ্য করেছে—এই নির্দিষ্ট দাবিগুলো এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে, মার্কিন সেন্টকম ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা নিশ্চিত করলেও ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন প্রকাশ করেনি এবং বলেছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো হামলা এড়িয়ে গেছে। তাই কাসেম বাসিরের প্রকৃত যুদ্ধক্ষমতা বিচার করতে হলে শুধু ইরানের ঘোষণার ওপর নয়, ভবিষ্যৎ সংঘাতে এর ব্যবহার, লক্ষ্য শনাক্ত করার সক্ষমতা, চূড়ান্ত পর্যায়ের নির্ভুলতা এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতার প্রমাণের দিকেও নজর রাখতে হবে। পার্সটুডে

(0)Comments

 

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.