ঢাকায় একদিনে পাঁচটি লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। এক. সাভারের আমিনবাজারে এসবির এক এসআইকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দুই. মিরপুরের দারুসসালামে নিজ বাসায় এক নারীকে গুলি করা হয়েছে। তিন. কদমতলীতে দোকানে ঢুকে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করা হয়েছে। চার. সবুজবাগে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। পাঁচ. যাত্রাবাড়িতে গুলি করে এক যুবককে হত্যা করা হয়েছে। যুগান্তরের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব ঘটনা ঘটেছে শনিবার সন্ধ্যা থেকে রোববার ১০টার মধ্যে। এর আগে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে মুখে স্কসটেপ লাগানো এক ব্যাক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীর হেচকা টানে অটোরিকশা থেকে পড়ে এক স্কুল শিক্ষিকার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। খোদ রাজধানীতে যদি আইনশৃঙ্খলার এই হাল হয়। তবে দেশের অন্যত্র কী পরিস্থিতি, সহজেই অনুমান করা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, সম্প্রতি রংপুরের একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ হত্যা করা হয়েছে। এ ধরনের হত্যাকা- প্রায়ই ঘটছে। এছাড়া সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি তো বলতে গেলে সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গুলিবাজি ইদানিং বেড়ে গেছে, যা নাগরিক উদ্বেগকে একেবারে প্রান্ত সীমানায় নিয়ে গেছে। মানুষ শংকিত ও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্তÑ কোথাও মানুষের জীবন ও সম্পদ-সম্পত্তির নিরাপত্তা নেই। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ কয়েকটি এলাকা হত্যাকা-, সন্ত্রাস, ছিনতাই, রাহাজানির অভয়ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অনুরূপভাবে চট্টগ্রাম-খুলনা প্রভৃতি মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা অপরাধীদের অবাধ বিচরণক্ষেত্রে পর্যবসিত হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তথ্য মতে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে গত মে মাস পর্যন্ত মহানগরে অন্তত ১২৫টি খুনের মামলা হয়েছে। চলতি বছরের সাত মাসে খুন হয়েছে অন্তত ২৫ জন। জেলার রাউজান উপজেলা তো হত্যার উপত্যকার কুখ্যাতি লাভ করেছে। অতি সম্প্রতিও সেখানে খুনের ঘটনা ঘটেছে। খুলনা মহানগরীতে খুন-খারাবী হরহামেশাই ঘটছে। গত ২০ মাসে সেখানে অন্তত ৬১ জন খুন হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে সারাদেশে হত্যা মামলা হয়েছে ১৭৮২টি। আগের বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১৫৮৫টি।
শুধু হত্যাই নয়, অন্যান্য অপরাধও সমানতালে বেড়েছে ও বাড়ছে। শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ, পারিবারিক বিরোধে খুন-জখম ইত্যাদির কথা এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। দেখা যাচ্ছে, পরিবারের বাইরের ব্যাক্তিদের দ্বারা যেমন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, তেমনি পরিবারের সদস্যদের দ্বারাও আক্রান্ত হচ্ছে। নওগাঁর আত্রাইয়ে স্বামীর দ্বারা স্ত্রী-সন্তান হত্যা, দিনাজপুরে ছেলেদের দ্বারা পিতা ও সৎ ভাই হত্যা, মানিকগঞ্জে দেবরের দ্বারা ভাবি-ভাতিজা হত্যা, রাজধানীর কলাবাগানে স্বামীর দ্বারা স্ত্রী ও শাশুড়ি হত্যা এবং সুনামগঞ্জে পিতার দ্বারা দুই শিশু পুত্র হত্যার অভিযোগ পরিবার ও সমাজের যে চিত্র তুলে ধরে, তাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে অভিহিত করা যায় না। সূত্র মতে, ছয় মাসে সারাদেশে পারিবারিক হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে ১৯টি। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৫০ জন। পর্যবেক্ষকদের মতে, পারিবারিক-সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ এবং পারিবারিক হত্যাকা-ের মূল কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যক্তির অনিয়ন্ত্রিত লোভ-লালসা, অভাব, দারিদ্র্য, হিংসা-প্রতিশোধস্পৃহা ইত্যাদি। নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা সুরক্ষার দায়িত্ব সরকারের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা পুলিশ সরকারের পক্ষে এ দায়িত্ব পালন করে। যেহেতু আইনশৃঙ্খলার শোচনীয় অবনতি ঘটেছে ও ঘটছে সেহেতু নাগরিক সাধারণ কি ধরে নেবে, পুলিশ ব্যর্থ হচ্ছে বা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে? সন্দেহ নেই, নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ যথেষ্ট দক্ষতা ও পারঙ্গমতার পরিচয় দিতে পারছে না। এর যুক্তিসঙ্গত বিবিধ কারণ আছে। সরকারকে কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং তার দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। ফ্যাসিস্ট-সহযোগী হিসেবে পুলিশের ভাবমর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ভাবমর্যাদা পুনরুদ্ধার করা সরকারের জন্য এবং পুলিশের শীর্ষকর্মকর্তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক, এতে সফল হওয়ার বিকল্প নেই। পুলিশ সক্রিয় ও দায়িত্বশীল হলে এবং জবাবদিহির আওতায় এলে স্বাভাবিকভাবেই আশা করা যায় আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হবে, নাগরিক নিরাপত্তা যতটা সম্ভব নিশ্চিত হবে।
প্রশ্ন হলো, আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে যে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে, তা দূর করা ছাড়া কি আইনশৃঙ্খলার কাক্সিক্ষত উন্নতি, নাগরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সম্ভব? সম্ভব নয়। কাজেই, সর্বত্র মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার কাজে হাত দিতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিজ নিজ বলয়ে মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা ও সুনৈতিকতা সর্বক্ষেত্রে মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পরিবারের প্রধানকে ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার চর্চা পরিবারের মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে। সমাজনেতাদের দায়িত্ব নিতে হবে সামাজিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ বিকাশে। এভাবে রাষ্ট্র বা সরকারও তার দায়িত্ব পালন করবে। তাহলে দেখা যাবে, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ভেতর থেকেই ধীরে ধীরে বদলে গেছে। তারপরও অপরাধ থাকবে না, এমন দাবি করা যায় না। কারণ, মানুরে মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বিদ্যমান রয়েছে। রাষ্ট্র, সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তাই সবসময় কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অপরাধীদের ব্যাপারে শূন্য সহিষ্ণুতা দেখাতে হবে। সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক নিরাপত্তা বিধানে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে, আমরা এটাই প্রত্যাশা করি।
(0)Comments