দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকলেও মূলত দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্তহীনতা ও সরকারের অযোগ্য নেতৃত্বের কারণেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে চরম সংকট বিরাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিলে মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ আদায়কে 'ডিজিটাল চাঁদাবাজি' আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে 'তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ' শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান (ঢাকা-১৫) সংসদে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান বলেন, 'বিদ্যুৎ আর গ্যাস কারও দয়া নয়, এটি মানুষের অধিকার।
সক্ষমতা নয়, সমস্যা বকেয়ার দুষ্টচক্র ও অব্যবস্থাপনায়
বিদ্যুৎ খাতের পরিসংখ্যান তুলে ধরে জামায়াতের এই আইনপ্রণেতা বলেন, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। আর পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ থেকে সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। সক্ষমতার তুলনায় চাহিদা অনেক কম হওয়ার পরও দেশে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।
এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, 'বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কাছে সরকারের বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এর কারণে তারা কয়লা, তেল বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কিনতে পারছে না। ফলে উৎপাদন কমছে। অন্যদিকে, এই উৎপাদকদেরই আবার বসিয়ে বসিয়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে।'
প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা মাসজুড়ে অচল পড়ে থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
গ্যাস সংকট ও এলএনজিতে লুটপাটের অভিযোগ
গত ১৭ বছরে অনশোর বা অফশোরে কোনো গ্যাসকূপ খনন বা পুনঃখনন (ওয়ার্কওভার) করা হয়নি বলে অভিযোগ করে ব্যারিস্টার মোমেন বলেন, 'দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ৮৪৯ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। প্রতিদিন গ্যাসের ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ গত অর্থবছরে আমাদের গলার কাঁটা এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা।'
সম্প্রতি একটি এফএসআরইউতে (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) আগুন লাগার ঘটনাটি ষড়যন্ত্র বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড কি না, তা তদন্ত করে জাতিকে জানানোর দাবি জানান তিনি।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট উত্তরণে সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
পাশাপাশি এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে সরকারদলীয় ব্যক্তিদের বিনা গ্যারান্টিতে লাইসেন্স দেওয়া এবং তৃতীয় এফএসআরইউ কেনায় এক সরকারদলীয় সদস্যের আত্মীয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে স্বচ্ছতার স্বার্থে বিষয়গুলো প্রকাশের দাবি জানান তিনি।
ডিমান্ড চার্জের নামে 'ডিজিটাল চাঁদাবাজি'
ভুতুড়ে বিল ও অযৌক্তিক চার্জের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংসদে সরকারি দলের পক্ষ থেকে মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখনও তা আদায় করা হচ্ছে।
'হিসাব অনুযায়ী, চার থেকে সাড়ে চার কোটি গ্রাহকের কাছ থেকে মাসে প্রায় ১৯০ কোটি টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং ৮০ থেকে ১৬০ কোটি টাকা মিটার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমি একে 'ডিজিটাল চাঁদাবাজি' বলতে চাই। মানুষের ওপর এই জুলুম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে,' বলেন এই সংসদ সদস্য।
সংকট সমাধানে জামায়াত এমপির ৪ প্রস্তাব
শুধু সমালোচনা নয়, সংকট উত্তরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বেশ কিছু প্রস্তাবও সংসদে তুলে ধরেন ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
১. ওপেন অ্যাকসেস পদ্ধতি চালু:
বকেয়া বিলের কারণে উৎপাদকরা বিদ্যুৎ দিতে পারছেন না, অন্যদিকে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে 'ওপেন অ্যাকসেস' পদ্ধতি চালু করে শিল্পকারখানাগুলোকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।
২. জরুরি সেল গঠন:
সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তত্ত্বাবধানে কার্যকর একটি 'জ্বালানি জরুরি সেল' গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। এ সেলের অধীনে পেট্রোবাংলা, পিডিবি, পিজিসিবি ও বিপিসিকে একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত কাঠামোর আওতায় আনার কথা বলেন তিনি।
৩. কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার:
দেশে প্রায় ৬ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জ্বালানি ও এলসি নিশ্চিত করে দ্রুত সেখান থেকে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন।
৪. অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বকেয়া বিল পরিশোধ:
বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, সে জন্য সবার আগে জ্বালানি কেনার বকেয়া বিল পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।
ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান বলেন, 'বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শুধু সম্পদের ঘাটতি নয়, সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো সিদ্ধান্তের গতিতে। বিদ্যমান সম্পদ ও নির্মিত অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।'
(0)Comments