বিদেশে অবস্থানরত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখাবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, বেনজীরের অবস্থান নিশ্চিত করা, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগ যাচাই এবং দেশে-বিদেশে তাঁর অবৈধ সম্পদ শনাক্ত ও জব্দে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমের উত্থাপিত ১৪৭ বিধির নোটিশের ওপর বক্তব্যকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সংসদের সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
প্রস্তাবের ওপর প্রায় দুই ঘণ্টা আলোচনা শেষে কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। সাধারণত বিরোধী দলের আনা প্রস্তাব গৃহীত হয় না। এক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা গেল।
সংসদে প্রস্তাবটি এনেছিলেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিনকাসেম। ভোটে গৃহীত প্রস্তাবটি হলো—'সংসদের অভিমত এই যে, ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ কীভাবে দুবাইতে জামিন পেলেন— এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যথা শিগগিরই জাতীয় সংসদকে অবহিত করবেন। এই ঘৃণ্য অপরাধীকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে? সে সম্পর্কে মীর আহমাদ বিন কাসেমকে এবং সংসদের প্রতিটি সদস্যদে যথাসময়ে যথা শিগগিরই অবহিত করবেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বেনজিরসহ বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখাবে না। তিনি জানান, বেনজীরের বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করা, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগ যাচাই এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ শনাক্ত ও জব্দে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বেনজীরকে 'সিরিয়াল কিলার' বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
নিজের বক্তব্যে ২০০৯ সাল থেকে গুম–খুন–নির্যাতনের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বেনজীর আহমদকে 'সিরিয়াল কিলার' আখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই নির্যাতনের হাতিয়ার এবং যে দুষ্কৃতকারীরা ছিল তার মধ্যে শেখ হাসিনার পরে বেনজীরকে 'নাম্বার ওয়ান' বলা যায়।
বেনজিরকে ফিরিয়ে আনতে সরকারের উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরে স্বরাষট্রমন্ত্রী বলেন, 'আমাদেরকে দায়ী না করে আপনারা সহযোগিতা করবেন।'
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হয়, যা এখনো কার্যকর রয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ জুন এনসিবি আবুধাবি বাংলাদেশকে জানায়, বেনজীর সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। ইউএইর আইনে ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানোর কথা থাকলেও বাংলাদেশ মাত্র চার দিনের মধ্যে, ১৬ জুন, কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্র্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ইউএইর মধ্যে কোনো দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। তাই দেশটির অভ্যন্তরীণ আইন ও পারস্পরিক সহযোগিতার নীতির ভিত্তিতে প্রক্রিয়াটি চলছে। ইউএইর চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত নথিপত্র ৪ আগস্ট পাঠানো হয়েছে। পরে আরও আইনি ব্যাখ্যা চাওয়া হলে ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে। এ জন্য ইউএইতে একটি ল' ফার্মও নিয়োগ করা হয়েছে। বেনজীরের অবস্থান জানতে ইন্টারপোলে তথ্য চাওয়া
বেনজীর জামিন পেয়েছেন—গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশের পর তাঁর অবস্থান ও চলাচল সম্পর্কে সতর্কতা বজায় রাখতে এনসিবি আবুধাবিকে অনুরোধ করা হয়েছে। ৩১ আগস্ট তাঁর বর্তমান অবস্থান জানতে ইন্টারপোলের নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থায় আনুষ্ঠানিক তথ্য চাওয়া হয়েছে। তিনি ইউএই ছেড়ে সেন্ট লুসিয়ায় গেছেন—এমন খবরের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'জুডিশিয়াল প্রসেস ফলো করতে হবে। হ্যাঁ এখানেই প্রশ্ন। আমরা কাউকে ধরে বেঁধে ফাঁসি দিতে পারি না। একজন অপরাধী, যত বড় অপরাধীই হোক, তাকে জুডিশিয়াল প্রসেসের মধ্য দিয়ে এসেই এবং আদালতের রায় অনুসারে সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে। এই জুডিশিয়াল প্রসেসটা একটু লম্বা হয়। আইনের হাত যেমন লম্বা, জুডিশিয়াল প্রসেসটাও অনেক লম্বা। সুতরাং আমাদেরকে ধৈর্য ধরতে হবে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং জুডিশিয়াল প্রসেসের ওপর আমাদেরকে বিশ্বাস রাখতে হবে।' পলাতক আসামিদের ফেরাতে শৈথিল্য নয়
শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'বেনজীর আহমদসহ বিদেশে অবস্থানরত কোনো পলাতক আসামিকে আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকার কোনো ধরনের শৈথিল্য প্রদর্শন করবে না।' তিনি বলেন, তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করা, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগ যাচাই এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ শনাক্ত ও জব্দে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা বিতর্ক করব, তর্ক করব, দ্বিমত হবো, দ্বিমত পোষণ করব। কিন্তু ফ্যাসিজম, আওয়ামী লীগ ও পতন যেখানেই হোক তার প্রতিরোধের জন্য আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ।' জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা ধরে রাখতে এই ঐক্য সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান তিনি।
(0)Comments