র জ

জাতীয় বন্য প্রাণী কমিশন: কেন এবং কী উদ্দেশ্যে

Image
২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, দেশের সংকটাপন্ন বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ, বন্য প্রাণীর সুরক্ষা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি বন্য প্রাণী কমিশন গঠন করেছে। কমিশনের প্রধান হিসেবে থাকবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক। আরও আট সদস্যের মধ্যে আমার নামও রয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, হাতিসহ অন্যান্য বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও সুরক্ষা, বন বিভাগের অবৈধভাবে দখলকৃত জমি পুনরুদ্ধার, সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা, বন্য প্রাণীর খাদ্য নিশ্চিতকরণ, মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত কমানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো বিষয়ে কমিশন সরকারকে পরামর্শ দেবে। কমিশনের সদস্য হিসেবে প্রাথমিক সভায় অংশ নেওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, উদ্যোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে কমিশনের উদ্দেশ্য, ক্ষমতা ও স্বাতন্ত্র্য আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে এটি আরেকটি সাধারণ পরামর্শক কমিটিতে পরিণত না হয়। এটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা নয়; বরং প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণে কমিশন কী এমন অতিরিক্ত মূল্য সৃষ্টি করবে, যা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এককভাবে করা সম্ভব নয়? প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত অনেক কাজ বন অধিদপ্তর, বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য অংশীজনের সমন্বয়ে করা সম্ভব। তাই কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হওয়া উচিত দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হওয়া নয়; বরং জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ, অগ্রাধিকার স্থাপন, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অর্থাৎ কমিশনের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, বাংলাদেশের বন্য প্রাণীর অবস্থা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছে? এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনায় তিনটি বিষয়কে স্পষ্টভাবে পৃথক করা দরকার—নীতি, বিজ্ঞান ও বাস্তবায়ন। ১. বন্য প্রাণী কমিশনকে কী অর্জন করতে হবে: কমিশন হবে জাতীয় পর্যায়ের নীতি ও তদারকির প্রতিষ্ঠান। এর দায়িত্ব হতে পারে জাতীয় বন্য প্রাণী সংরক্ষণকৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া; গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি ও আবাসস্থলের অগ্রাধিকার নির্ধারণ; জাতীয় কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বন অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় করা। কমিশনকে কার্যকর ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে এর সদস্য গঠনে বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। বন অধিদপ্তরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় নিশ্চিত করার জন্য সদস্যসচিব হিসেবে সংশ্লিষ্ট বন্য প্রাণী কর্মকর্তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কমিশনের অন্য সদস্যদের মধ্যে বিচার, বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, পরিবেশ, গবেষণা, অর্থনীতি ও জনসম্পৃক্ততার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে এর স্বাধীন ও বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আরও শক্তিশালী হবে। কমিশনের প্রধান হিসেবে একজন সম্মানিত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি দায়িত্ব পালন করতে পারেন। বিকল্পভাবে প্রাণিবিদ্যা, জীববিজ্ঞান বা পরিবেশবিজ্ঞানে জাতীয় পর্যায়ের খ্যাতিসম্পন্ন কোনো অবসরপ্রাপ্ত উপাচার্য বা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদও এ দায়িত্বের জন্য বিবেচিত হতে পারেন। এতে কমিশনের নীতিগত নিরপেক্ষতা, পেশাগত মর্যাদা ও জন–আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে। কমিশনের কার্যকর দায়িত্ব পালনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সচিবালয় বা স্থায়ী অফিসও প্রয়োজন। পর্যাপ্ত জনবল, গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা ছাড়া কমিশনের দীর্ঘমেয়াদি তদারকি এবং নীতিগত দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করা কঠিন হবে। মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত, বন্য প্রাণী অপরাধ, অবৈধ বাণিজ্য, আবাসস্থল ক্ষয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জাতীয় সমস্যায় কৌশলগত সুপারিশ এবং প্রয়োজনীয় আইন, বাজেট, জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়েও কমিশন সরকারকে পরামর্শ দিতে পারে। কমিশন নিজে প্রতিদিন মাঠে গিয়ে উদ্ধার বা ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবে না; বরং নিশ্চিত করবে যে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ নীতি, সম্পদ ও বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা নিয়ে কাজ করছে এবং কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হচ্ছে। ২. বন্য প্রাণী পরামর্শক বোর্ড: বৈজ্ঞানিকভাবে কী করা উচিত: বন্য প্রাণী পরামর্শক বোর্ডের ভূমিকা হওয়া উচিত কমিশন থেকে স্বতন্ত্র একটি বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করা। এর মধ্যে জীববিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, পরিবেশবিদ্যা, প্রাণিচিকিৎসা, জিনতত্ত্ব, প্রাণীর আচরণবিজ্ঞান ও ভূদৃশ্য ব্যবস্থাপনার বিশেষজ্ঞরা থাকতে পারেন। বোর্ড বিভিন্ন প্রজাতির অবস্থা ও জনসংখ্যার তথ্য, গবেষণার ফলাফল, বিপন্ন প্রজাতির পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা, বন্য প্রাণী স্থানান্তর বা পুনঃপ্রবর্তন, সংরক্ষিত এলাকার ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং রোগ ও প্রাণিচিকিৎসা–সংক্রান্ত বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজন হলে কমিশন ও সরকারকে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মতামত দেবে। অর্থাৎ কমিশন বলবে কী অর্জন করতে হবে; পরামর্শক বোর্ড বলবে বৈজ্ঞানিকভাবে কীভাবে তা করা উচিত। ৩. মাঠপর্যায়ের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা: বাস্তবায়ন করবে কে: বাংলাদেশে বন অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে বন, বনভূমি, সংরক্ষিত এলাকা ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে। এর রয়েছে মূল্যবান মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, অবকাঠামো ও জনবল। ভবিষ্যতের যেকোনো সংস্কারকে তাই এই বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে সমন্বয় করেই এগোতে হবে। তবে আধুনিক বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ক্রমেই একটি বিশেষায়িত পেশাগত ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। প্রজাতির জনসংখ্যা পর্যবেক্ষণ, প্রাণিচিকিৎসা, রোগতত্ত্ব, প্রজাতি পুনরুদ্ধার, বন্য প্রাণী অপরাধ, মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং ভূদৃশ্যভিত্তিক সংরক্ষণের জন্য বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন। এ কারণে ভবিষ্যতে বন অধিদপ্তরের ভেতরে একটি আরও শক্তিশালী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বন্য প্রাণী সেবা গড়ে তোলা হবে, নাকি পৃথক বিশেষায়িত বন্য প্রাণী সেবা/অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হবে, এটি একটি নীতিগত প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। যে কাঠামোই গ্রহণ করা হোক, মাঠপর্যায়ের দায়িত্বের মধ্যে থাকবে বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণ, উদ্ধার ও পুনর্বাসন, প্রজাতি পুনরুদ্ধার, প্রাণিচিকিৎসা, বন্য প্রাণী অপরাধ মোকাবিলা, মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত ব্যবস্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির বিশেষ ব্যবস্থাপনা, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বিশেষায়িত বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা বন অধিদপ্তরের ভূমিকা কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব নয়। বন ও বন্য প্রাণী পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কিত। বনভূমি সুরক্ষা, বন ব্যবস্থাপনা ও আবাসস্থল রক্ষায় বন অধিদপ্তরের ভূমিকা অপরিহার্য। একই সঙ্গে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনার কিছু ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞান ও জনবল প্রয়োজন। তাই ভবিষ্যতের কাঠামোর লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব 'কেড়ে নেওয়া' নয়; বরং কে কোন কাজটি সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে করবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে, তা স্পষ্ট করা। যদি ভবিষ্যতে পৃথক বন্য প্রাণী সেবা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, সেটিও বন অধিদপ্তরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়; বরং বন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বিত একটি বিশেষায়িত সেবা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশ বন্য প্রাণী কমিশনকে যেন আরেকটি সভাভিত্তিক পরামর্শক সংস্থায় পরিণত না করা হয়, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের কার্যকারিতা কতটি সভা হয়েছে বা কতটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে নয়; বরং সংরক্ষণের বাস্তব ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত। প্রতি দুই বা তিন বছর পর কমিশনের সামনে প্রশ্ন থাকতে পারে— বাঘ, হাতি, ডলফিন, মেছো বিড়াল, শকুন, ধনেশ, ঘড়িয়াল ও অন্যান্য বিপন্ন প্রজাতির অবস্থা কি উন্নত হয়েছে? তাদের আবাসস্থল ও চলাচলের পথ কি নিরাপদ হয়েছে? মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত কি কমেছে? গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলের গুণগত মান কি বেড়েছে? বন্য প্রাণী অপরাধ ও অবৈধ বাণিজ্য কি কমেছে? অর্থাৎ সাফল্যের মূল সূচক হবে, বাংলাদেশের বন্য প্রাণী ও তাদের আবাসস্থলের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে কি না। এ কাঠামোর মূল দর্শন খুব সহজভাবে বলা যায়: বন্য প্রাণী কমিশন—নীতি, সমন্বয় ও জবাবদিহি। বন্য প্রাণী পরামর্শক বোর্ড—বিজ্ঞান ও পেশাগত মূল্যায়ন। বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা সেবা মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন। আর বন অধিদপ্তর থাকবে বন ও বনভূমি সুরক্ষা, ব্যবস্থাপনা এবং বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বৃদ্ধি নয়। লক্ষ্য হলো এমন একটি পেশাদার, বিজ্ঞানভিত্তিক, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নীতি, বিজ্ঞান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সুস্থ ও সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্রে বন্য প্রাণীর টেকসই সংরক্ষণ, নিরাপদ আবাসস্থল ও স্বাভাবিক সংখ্যা নিশ্চিত করা এবং একটি পেশাদার, বিজ্ঞানভিত্তিক, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। রেজা খান বন্য প্রাণী, চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্ক বিশেষজ্ঞ মতামত লেখকের নিজস্ব
জাতীয় বন্য প্রাণী কমিশন: কেন এবং কী উদ্দেশ্যে
View on original source
Share
Archive
Like

(0)Comments

 

Related Opinion

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.