একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতি আর কেবল তেল, গ্যাস কিংবা ঐতিহ্যবাহী ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এর প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডেটানির্ভর জ্ঞানভিত্তিক শিল্প। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী। তারা স্বাধীন কর্মজীবন, নতুন উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নিজেদের সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে চায়।
তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে তরুণদের এই আকাক্সক্ষাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলা প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন দেশের প্রতিটি উপজেলায় আইসিটি ল্যাব স্থাপন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে সরকারি উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি পদক্ষেপ।
এতে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, ফ্রিল্যান্সিং এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে তরুণদের দক্ষ করার পরিকল্পনা। এই ঘোষণাটি তাই কেবল নতুন কিছু কম্পিউটার বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি হতে পারে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান কাঠামো, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের ধারা বদলে দেওয়ার এক শক্তিশালী অনুঘটক।
বাংলাদেশে প্রযুক্তির বিস্তার দ্রুত ঘটলেও তার সুযোগ এখনো সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছেনি। রাজধানী ঢাকা ও বড় শহরগুলোর তরুণরা তুলনামূলকভাবে ভালো ইন্টারনেট, আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং পেশাগত নেটওয়ার্কের সুবিধা পেয়ে থাকে। অন্যদিকে, উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলের বহু তরুণ মেধা ও তীব্র আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও উন্নত প্রশিক্ষণ, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, উপযুক্ত ডিভাইস কিংবা দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাবে সম্ভাবনার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে।
এই বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায় থেকে প্রযুক্তির বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একজন গ্রামীণ তরুণকে আধুনিক প্রযুক্তি শিখতে যদি আর রাজধানীমুখী হতে না হয় এবং নিজ এলাকাতেই দ্রুতগতির ইন্টারনেট, মানসম্মত সফটওয়্যার ও প্রশিক্ষকের সান্নিধ্য মেলে, তবে সে নিজ ভিটেমাটিতে বসেই ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডেটা অ্যানালিটিকস, সাইবার নিরাপত্তা কিংবা এআইভিত্তিক কাজের দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। ফলে প্রযুক্তির অবকাঠামোগত বিকেন্দ্রীকরণ একই সাথে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করবে।
তবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সংখ্যার চেয়ে কাজের মানের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। শুধু কতজন প্রশিক্ষণ পেল তা দিয়ে সাফল্যের প্রকৃত সূচক নির্ধারিত হতে পারে না; বরং প্রশিক্ষণ শেষে কতজন নিয়মিত আয় করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকতে পারছেন কিংবা স্থায়ীভাবে প্রযুক্তি খাতে যুক্ত হচ্ছেন—সেটিই হবে আসল মাপকাঠি।
প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব কর্মসংস্থানের মধ্যকার ব্যবধান দূর করাটাই এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একজন তরুণকে কয়েকমাসের প্রাথমিক ফ্রিল্যান্সিং শেখানো সহজ হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার কাজ অত্যন্ত কঠিন, যার জন্য ইংরেজি যোগাযোগদক্ষতা, পেশাগত আচরণ, পোর্টফোলিও তৈরি এবং ক্লায়েন্ট ব্যবস্থাপনার সঠিক দিকনির্দেশনা দরকার। তাই উপজেলা আইসিটি ল্যাবকে কেবল কম্পিউটার শেখানোর কেন্দ্র না বানিয়ে তরুণদের পরি পূর্ণ 'ডিজিটাল ক্যারিয়ার সেন্টার' হিসেবে গড়ে তোলা আবশ্যক।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উত্থানের কারণে কেবল প্রচলিত বা প্রাথমিক স্তরের ফ্রিল্যান্সিং দক্ষতা আর যথেষ্ট নয়। এআই ইতোমধ্যে সফটওয়্যার, ডিজাইন, গবেষণা এবং উৎপাদনশীলতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এনেছে। ফলে দেশের তরুণদের এমন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করতে হবে, যা আগামী কয়েক দশক ধরে বিশ্ববাজারে প্রাসঙ্গিক থাকে। প্রোগ্রামিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, অটোমেশন এবং এআইকে প্রতিযোগী হিসেবে না দেখে নিজের কাজের গতি বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে,বিশ্ব শ্রমবাজারে বাংলাদেশকে এতদিন কেবল গতানুগতিক জনশক্তি রপ্তানিকারক হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু উপজেলা আইসিটি ল্যাবগুলোর সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন তরুণও নিজ ঘরে বসেই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা এশিয়ার শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হবে। এটি কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়ন আনবে না, ঢাকামুখী স্থানান্তরের চাপ কমিয়ে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন গতি সঞ্চার করবে।
এই কাঠামোগত রূপান্তর নারী সমাজের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণেও একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। সামাজিক ও পারিবারিক নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক নারী ঘরের বাইরে প্রচলিত কর্মক্ষেত্রে যেতে পারেন না। কিন্তু নমনীয় কাজের পরিবেশ থাকায় উপজেলা ল্যাবের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করে নারীরা ঘরে বসেই স্বাবলম্বী হওয়ার বড় সুযোগ পাবেন।
তবে এ সুবিধা নিশ্চিত করতে নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ, ডিভাইসে সহজ প্রবেশাধিকার এবং প্রয়োজনবোধে আলাদা প্রশিক্ষণ ব্যাচ ও ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
এর পাশাপাশি, সাধারণ জনগণকে সরকারি বিভিন্ন ডিজিটালাইজড সেবা সম্পর্কে সচেতন করা এবং সেবা গ্রহণে সক্ষম করে তোলার ক্ষেত্রেও এসব ল্যাব 'ডিজিটাল সাক্ষরতার কেন্দ্র' হিসেবে কাজ করতে পারে, যা সার্বিকভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দৈনন্দিন নাগরিক জীবনকে সহজ করবে।
এখানে একটি সত্য স্বীকার করতেই হবে যে, সরকারি যেকোনো ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো অবকাঠামো নির্মাণ করে তার সঠিক ব্যবহারের অভাব। অতীতে অনেক সরকারি প্রকল্পেই ভবনের আধুনিক সাজসজ্জা হলেও দক্ষ জনবল ও তদারকির অভাবে তা স্থবির হয়ে পড়েছে। আইসিটি ল্যাবগুলোর সাফল্য নির্ভর করবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, নিয়মিত কারিকুলাম হালনাগাদ এবং দক্ষ ট্রেইনারদের উপস্থিতির ওপর। প্রযুক্তির গতি দ্রুত বদলায় বলে প্রতি দুই বছর পর পর প্রশিক্ষণ কাঠামোর আধুনিকায়ন জরুরি।
স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিটি ল্যাবের অর্জিত ফল—যেমন প্রশিক্ষণার্থী ও তাদের আয়ের প্রকৃত হিসাব সম্বলিত ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। একই সাথে সরকারি প্রশিক্ষণের সঙ্গে সফটওয়্যার কোম্পানি, ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম এবং বেসরকারি আইটি শিল্পখাতের সংযোগ বা পার্টনারশিপ তৈরি করতে হবে, যাতে তরুণরা কাজ শেখার পরপরই ইন্টার্নশিপ ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পায়।
পরিশেষে বলা চাই, বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিতে প্রতিদিন যে বিশাল তরুণ সমাজ যুক্ত হচ্ছে, তাদের সবার জন্য প্রচলিত সরকারি বা বেসরকারি চাকরি তৈরি করা বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই প্রযুক্তিভিত্তিক স্বাধীন কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিই এই সংকটের সবচেয়ে টেকসই সমাধান। তবে এই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে উপজেলা আইসিটি ল্যাবকে বিচ্ছিন্ন কোনো অবকাঠামোগত প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ 'ডিজিটাল স্কিল ইকোসিস্টেম' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
পিছিয়ে পড়া উপজেলার জন্য বরাদ্দ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষক বেশি দিয়ে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে হবে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সমৃদ্ধি কেবল কতগুলো বড় সেতু বা বহুতল ভবন তৈরি হলো তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং আমরা তৃণমূলের কতজন তরুণকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত করতে পারলাম—সেটাই হবে আগামী দিনের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। সেই দূরদর্শী প্রস্তুতির রূপরেখা যদি প্রতিটি উপজেলা থেকে সঠিকভাবে শুরু হয়, তবে প্রান্তিক পর্যায় থেকেই একটি আত্মনির্ভরশীল ও উন্নত বাংলাদেশের আসল ভিত্তি গড়ে উঠবে ইনশাল্লাহ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com
(0)Comments