ব্রিকস সম্মেলনের আগে আমেরিকার উপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইরান । তারা চায় ব্রিকসের সদস্য দেশগুলি পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার আচরণের বিরোধিতা করুক । কিন্তু সেটা যে সহজে হয়ে যাবে তা মনে করার কোনও কারণ নেই ।
ইরানের সঙ্গে আরবের সম্পর্ক বেজায় জটিল। আর তার জেরে আমেরিকার বিরোধী আলোচনা সম্মেলনে কতটা হবে এবং মার্কিন মুলুকের সমালোচনা করে ঘোষণাপত্র জারি হবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ আছে । সাধারণত, এই ধরনের সম্মেলনের শেষে যে সমস্ত বিষয় সমস্ত পক্ষ রাজি হয় সেগুলিকে এভাবেই ঘোষণা করা হয়ে থাকে । কিন্তু ব্রিকসের থেকে সহনাভূতি আদায়ের চেষ্টা ইরান পুরোমাত্রায় করে চলেছে ।
ইরানের বিচার ব্যবস্থার প্রধান আয়তোল্লা গোলাম মহসেনি ইজাই। ব্রিকস দেশগুলির বিচারবিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি । প্রতিটি সদস্য় দেশকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, ঠিক কেন তাদের আমেরিকার নিন্দা করা উচিত । তাঁকে বলতে শোনা যায়, "বিশ্ব ব্যবস্থা পরিচালনের ব্যাপারে ব্রিকসের ভূমিকা খুবই বেশি হতে চলেছে আগামিদিনে । আর সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা চাই না কোনও শক্তি নিজেকে আইনের উপরে ভাবার ক্ষমতা পাক । আর তাই সকল সদস্য়ের উচিত আইনকে রক্ষা করা । আইনের পথে থাকা ।" তিনি মনে করেন, ইরানে মার্কিন হামলা শুধু বেআইনি বা অনৈতিক নয় আন্তর্জাতিক নিয়মের বাইরেও । ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আয়োজনে বিচার বিভাগীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে এই সম্মেলন বসেছিল 4-6 সেপ্টেম্বর।
ব্রিকসের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা অনেক দিক থেকেই করে চলেছে ইরান । তারা মনে করেছে সম্মেলনে যদি আমেরিকা বিরোধী প্রস্তাব কোনওভাবে পাশ করানো যায় সেটা বিশ্বের কাছে তাদের কূটনৈতিক জয় হবে । তাই একাধিক বৈঠক করে চলেছে ইরান । বিশ্বের জনসংখ্যার 45 শতাংশ এবং জিডিপির 40 শতাংশ ব্রিকসের আওতায় । 12 থেকে 13 সেপ্টেম্বর দিল্লিতে বসতে চলেছে সম্মেলনের আসর । রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন, চিনের শি জিনপিং এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজিশকিয়ান-সহ বিশ্বের আরও বিভিন্ন দেশের নেতারা এই সম্মেলনে অংশ নেবেন । আরব আমিরশাহির তরফে সম্ভবত প্রতিধিনিত্ব করবেন আবুধাবির কাউন প্রিন্স বিন মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহান ।
তবে ইরান সংঘাত ব্রিকসের মধ্য়ে থাকা দেশগুলির মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি করেছে । বিশেষ করে সৌদি আবর এবং আবর আমিরশাহির মতো দেশের এ ব্যাপারে নিজস্ব স্বার্থ সংঘাত আছে বলে সমস্য়া আরও গভীর । আরব আবার একাধিকবার তাদের দেশে ইরানের মিসাইল হামলার তীব্র নিন্দা করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ কুয়েতে হামলা নিয়েও প্রতিবাদে সরব হয়েছে। মক্কার অংশকে ধরে নিজেদের নিরাপত্তা আরও সুনিশ্চিত করার কাজ করেছে সৌদি আরব। এই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে গিয়েছে তুর্কিয়ে এবং পাকিস্তানও।
ব্রিকসের সদস্য দেশগুলি আমেরিকার আচরণ নিয়ে একমত হতে পারছে না বলেই মে মাসে বিদেশ মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের পরও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বিরোধিতা করে কোনও প্রস্তাব পাশ হয়নি। ওই বৈঠকেও ইরানের বিদেশ মন্ত্রী বাকিদের বোঝানোর চেষ্টা করেন তাঁদের উপর যে হামলা হয়েছে তা অনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক নিয়মকে মান্যতা দেয় না । এই ধরনের আগ্রাসনকে মেনে নেওয়ার কোনও কারণ থাকতেই পারে না। তিনি আরও দাবি করেন, একটি সদস্য দেশ আরব আমিরশাহির কথায় এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে কোনও যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব নয়। মে মাসের সেই বৈঠকের পর থেকে ইরান এবং আমেরিকার সম্পর্ক প্রতিনিয়ত আরও খারাপ হয়েছে। ৃ
ইরানের সঙ্গে সমস্ত ও আর্থিক বোঝাপড়া বাতিল করেছে আরব আমিরশাহি। তাদের দাবি গত অগাস্ট মাসে ইরানের মিসাইল দেশে আঘাত হেনেছে । এই মুহূর্তে ব্রিকসের সমর্থন পাওয়ার যে চেষ্টা ইরান করছে তার নেপথ্যে বেশ কয়েকটি জরুরি বিষয় আছে ৷ বিশেষ করে যে সময়টা তারা বেছে নিয়েছে তা সববিচারে ইঙ্গিতবহ।
যুদ্ধে সাময়িক বিরতি হলেও পরিস্থিতি নতুন করে খারাপ হতে শুরু করে। গত সপ্তাহের শেষে খার্গ দ্বীপে আমেরিকা ইরানের মিসাইল হামলা প্রতিহত করে। জর্ডনে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়েছিল তেহরান।
সবমিলিয়ে পরিস্থিতি যা তাতে প্রায় ছ'মাস ধরে চলতে থাকা যুদ্ধ এখনই বন্ধ হয়ে যাবে এমন ভাবার কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এই যুদ্ধের জেরে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে ।
পাল্টা আমেরিকাও ইরানকে আর্থিকভাবে দুর্বল করতে যা করা দরকার সবকিছু করছে। এ প্রসঙ্গে 'অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট' শুরু করেছে তারা। তাতে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা আর্থিক ক্ষেত্রগুলি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
ইরান প্রসঙ্গে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলি একমত না হওয়ায় ভারতের বিদেশ নীতি আচমকাই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সম্প্রতি এসইও নেতাদের বৈঠকে সে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে । সম্মেলনের শেষে প্রতিটি সদস্য দেশের তরফে ঘোষণা করা হয় ইরানে যে সামরিক হামলা হয়েছে সমর্থন করার কোনও কারণ নেই। ভারতসহ কয়েকটি দেশের সমর্থনে পাশ হওয়া এই বিবৃতিতে লেখা রয়েছে, হামলা চালানোর কাজ রাষ্ট্রসংঘের সনদ স্বীকৃত নয় । আর তাই অনেকেই মনে করেন আমেরিকার প্রতিবেশী দেশকে দিয়ে এ ধরনের বিবৃতি প্রকাশ করা মোটেই সহজ কাজ ছিল না
বিভিন্ন আরব দেশে কূটনৈতিকের কাজ করেছেন জাকিউর রহমান। তিনি মনে করেন এসসিও সম্মেলনে আরব আমিরশাহি অংশ নেয়নি। ব্রিকসে তারা অংশ নেবে। প্রকাশ্যেই ইরানের মার্কিন হানাকে অতীতে সমর্থন করেছে আরব। এমতাবস্তায় আমেরিকার নিন্দা করা কোনও প্রস্তাব তারা সম্মেলনে পাশ হতে দেবে এমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই।
(0)Comments