যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে আমরা যে খবর পড়ি, তার প্রায় সবই নেতিবাচক। ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগান যুদ্ধ এবং চলমান ইরান যুদ্ধ কোনোটাই যুক্তরাষ্ট্রের সুনাম বাড়ায়নি। গাজায় যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইসরায়েলকে ধ্বংসের মদদ জুগিয়েছে, তা নিয়ে আমাদের দেশে অনেক প্রতিবাদ হয়েছে।
সম্প্রতি ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও অনেক সমালোচনা হচ্ছে। এসব নিয়ে আমিও অনেক সমালোচনামূলক কলাম লিখেছি।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রর সবই কি নেতিবাচক? সবকিছুই কি সমালোচনার বিষয়? যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ভালো ও ইতিবাচক দিকগুলো আমরা অনেক সময় এড়িয়ে যাই। নানাভাবে সমালোচিত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও আরেক যুক্তরাষ্ট্র আছে, যার উন্মুক্ত সুযোগ–সুবিধা অনেক আলোচনা থেকেই বাদ পড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র শুধু যুদ্ধ, আধিপত্য ও ট্রাম্পের খামখেয়ালি নীতির ধারক নয়। যুক্তরাষ্ট্র মানুষের স্বপ্ন গড়ারও দেশ। পৃথিবীর সব জায়গা থেকে মানুষ আসে এখানে স্বপ্ন গড়তে। কে কার ছেলে, কার মেয়ে, কোথা থেকে এসেছেন, এসব কোনো ব্যাপার নয়। যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ নিজ নিজ মেধা দিয়ে নিজের স্বপ্ন গড়ে তোলে।
একজন বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে এসে ফাস্ট ফুড রেস্টুরেন্ট ম্যাকডোনাল্ডে কাজ করেছেন প্রথম সাত বছর, এখন তিনি বারোটা ম্যাকডোনাল্ডের মালিক। যাঁরা পেশাজীবী নন, তাঁদের অনেকেই ট্যাক্সি চালিয়ে বা ছোটোখাটো কাজ করে বাড়ি-গাড়ি কিনে ছেলেমেয়েদেরকে ভালো কলেজে পড়াচ্ছেন। তবে সবাইকে যুক্তরাষ্ট্রে আইন মেনে আসতে হয় এবং আইন মেনে চলতে হয়।
বাংলাদেশিরা নিউইয়র্ক শহরের জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, পার্কচেস্টার এবং ব্রুকলিনের চার্লস ম্যাকডোনাল্ডে গড়ে তুলেছেন ছোট ছোট বাংলাদেশ, তাঁরা সবাই নিজেদের পরিশ্রম দিয়ে কুড়িয়ে নিচ্ছেন নিজেদের সাফল্য। পৃথিবীর কোন জায়গায় বাংলাদেশিরা পাবেন এই সুযোগ?
সুন্দর পিচাই ভারতের তামিলনাড়ুর এক মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। তাঁর বাড়িতে একমাত্র ইলেকট্রনিকস যন্ত্র ছিল, একটা পুরোনো সাদাকালো টেলিভিশন। যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করে তিনি এখন গুগলের সিইও, তাঁর তিন বছরের পারিশ্রমিক প্যাকেজ ৬৯২ মিলিয়ন ডলার। অন্য দেশ থেকে আসা অসংখ্য পেশাজীবী মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, যাঁদের সাফল্য চোখে পড়ার মতো।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে রাজনীতিতেও আজকাল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসলমান অধিবাসী এবং তাঁদের সন্তানেরা দারুণভাবে উৎসাহিত এবং নিজেদের অবদান রাখছেন। তাঁদের অনেকেই মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে বিভিন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে দারুণ সাফল্য পাচ্ছেন।
বাংলাদেশি বংশধর রাজনীতিবিদেরাও পিছিয়ে নেই। হ্যানসেন ক্লার্ক প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত, যিনি ২০১১ সালে মিশিগান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্যপদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। নুসরাত জাহান চৌধুরী এখন একজন ফেডারেল বিচারপতি।
বিভিন্ন রাজ্যের সিনেটর হিসেবেও বেশ কয়জন নির্বাচিত হয়েছেন—শেখ রহমান (জর্জিয়া), নাবিলা ইসলাম (জর্জিয়া), সাদ্দাম সালিম (ভার্জিনিয়া) এবং আবুল খান (নিউ হ্যামশায়ার) তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
উগান্ডা থেকে আগত এক অভিবাসী পরিবারের সন্তান জোহরান মামদানিকে নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহর নিউইয়র্ক শহরের নির্বাচিত মেয়র।
এটাই শুধু তাঁর পরিচয় নয়। মামদানি যে প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক, তাঁকে অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য রাজ্যেও আরও অনেক প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন এবং তাঁদের বেশ কয়জনের সাফল্য নিশ্চিত।
তাঁদের মধ্যে একজন আবদুল আল-সাইয়েদ, এক মিসরীয় অভিবাসী দম্পতির সন্তান, যিনি মিশিগানে প্রাইমারি নির্বাচনে জয়লাভ করে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর প্রার্থী হয়েছেন। তিনি জনমত জরিপে বর্তমানে তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ৭ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন।
নভেম্বরে যদি তিনি সিনেটর নির্বাচিত হতে পারেন, তাহলে আবদুল আল-সাইয়েদই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলমান সিনেটর।
আজকে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের আরেকজন মুসলমান রাজনীতিবিদকে নিয়ে কথা বলব, তাঁর নাম ড. আয়শা ওয়াহাব। তিনি এক আফগান শরণার্থী দম্পতির মেয়ে, যিনি ছোটকালে মা-বাবা হারিয়ে এক ফস্টার কেয়ারে (সরকারি তত্ত্বাবধানে পালিত হওয়ার ব্যবস্থা) বড় হয়েছেন। আজ তিনি যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের একজন সম্মানিত সদস্য।
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার এক ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য পদত্যাগ করাতে যে আসনটি খালি হয়, সেখানে বিশেষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আয়শা ওয়াহাব কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর জয় সহজ ছিল না। তাঁকে পরাজিত করার জন্য ইসরায়েলি লবি আইপাক চার মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে।
কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪ কংগ্রেস এলাকা সান ফ্রান্সিসকোর জনগণ আয়শা ওয়াহাবকে বিপুলভাবে নির্বাচিত করেন তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে। এটা শুধু আয়শা ওয়াহাবের জয় নয়; যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতির এক বিরাট জয় এবং ইসরায়েলি লবি যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি যে হারে সমর্থন হারাচ্ছে, তার একটা বড় উদহারণ।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর অভিবাসী ও তাঁদের ছেলেমেয়েরা যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন এবং প্রাথমিক নির্বাচন করে বড় দলগুলোর মনোনয়ন পাচ্ছেন। তাঁদের সাফল্য গর্ব করার মতো।
আফগানিস্তানে এখন মেয়েদের চলাফেরা অনেক সীমাবদ্ধ, লেখাপড়ার সুযোগ আরও সীমিত। আয়শা ওয়াহাব যদি আফগানিস্তানে বড় হতেন, তাহলে আজ আয়শার মেধা ও স্বপ্ন কোনোটাই বিকশিত হওয়ার সুযোগ হতো না।
১৯৮৭ সালে নিউইয়র্কে আয়শা ওয়াহাবের জন্ম। তাঁর বাবা-মা ছিলেন আফগান শরণার্থী। আয়শার খুব অল্প বয়সেই তাঁর বাবা আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান এবং এর কিছুকাল পরেই তাঁর মা মারা যান। এরপর আয়শা ও তাঁর বোনকে ফস্টার কেয়ারে নেওয়া হয়; পরবর্তী সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আফগান পরিবার তাঁদেরকে দত্তক নেয়।
আয়শা ওয়াহাব ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করেন এবং পরে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সমাজকর্মে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। নির্বাচনী রাজনীতিতে আসার আগে আয়শা প্রযুক্তি খাত, অলাভজনক সংস্থা এবং সামাজিক ও জনস্বার্থমূলক প্রচারণায় কাজ করেছেন।
তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকায় অবস্থিত হেওয়ার্ডে স্থানীয় রাজনীতি এবং সাশ্রয়ী আবাসনবিষয়ক প্রচারণায় ক্রমে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ২০১৮ সালে তিনি হেওয়ার্ড সিটি কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার আগপর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন।
সাম্প্রতিক কংগ্রেস নির্বাচনে ইসরায়েল ও গাজা যুদ্ধ নিয়ে আয়শার মতামত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এপ্রিল মাসে প্রার্থীদের নিয়ে আয়োজিত এক ফোরামে তিনি বলেছিলেন যে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর যা ঘটছে, তাকে তিনি 'গণহত্যা' হিসেবেই বিবেচনা করেন।
তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হার্নান্দেজ অবশ্য তাঁর সঙ্গে একমত হননি। হার্নান্দেজও ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য, তাঁকে নির্বাচিত করার জন্য ইসরায়েলি লবি আইপাক বিপুল অর্থ ব্যয় করে। আইপাকের এই অর্থব্যয় বিফলে গেল, আয়শা ওয়াহাবই নির্বাচনে জয়লাভ করলেন।
এই জয় ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরে প্রগতিশীল ও ইসরায়েলি সমর্থক অংশের মধ্যকার বৃহত্তর দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন। এইবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অনেক ইসরায়েলপন্থী প্রার্থী কুপোকাত হয়েছেন। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই, কারণ এখন দুই–তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, গাজা যুদ্ধে ইসরায়েল গণহত্যা করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উচিত ইসরায়েলে অস্ত্রশস্ত্র ও আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে দেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীলেরা, বিশেষ করে মুসলমান রাজনীতিবিদেরা মার্কিন জনমতের সুযোগ নিয়ে এইবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অনেক ভালো করতে পারবেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আশা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকেও বাহবা দিতে হয়—ইলহাম ওমর, রাশিদা তালিব, লতিফ সাইমন, গাজালা হাশমি, জোহরান মামদানি, আবদুল আল-সাইয়েদ, আয়শা ওয়াহাবের মতো অপরিচিত নামের মুসলমান প্রার্থীদের ভোট দিয়ে তাঁরা নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করছেন, বিশেষভাবে ইসরায়েলি লবি ও রিপাবলিকান পার্টি যখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে অনবরত বিষোদ্গার করছে। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই তা সম্ভব, এই যেন আরেক যুক্তরাষ্ট্র!
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: [email protected]
(0)Comments