ম . ব হ উদ দ ন আল ইমর ন

বিচারকদের বাণিজ্যিক কোচিং: নিষেধাজ্ঞা কতটা যৌক্তিক

Image
বিচারকেরা বাণিজ্যিক কোচিং কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে পারবেন না—বাংলাদেশের বিচার বিভাগে সম্প্রতি এ বিষয়ে নতুন নির্দেশনা এসেছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত সরাসরি বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কোচিং কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার বিষয়ে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের জন্য নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়েছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও জন-আস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এর পক্ষে-বিপক্ষে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও আছে, যা বিচারিক স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, স্বার্থের সংঘাত এবং জনস্বার্থের আলোকে দেখা প্রয়োজন। বিচারকের পদ অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে স্বতন্ত্র। একজন বিচারকের সিদ্ধান্ত মানুষের স্বাধীনতা, সম্পত্তি, ব্যবসা, পারিবারিক অধিকার, এমনকি জীবন-মৃত্যুর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিচারকের ক্ষেত্রে শুধু প্রকৃত পক্ষপাত এড়িয়ে চলাই যথেষ্ট নয়; এমন পরিস্থিতিও এড়াতে হয়, যাতে সাধারণ মানুষের মনে বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। কানাডিয়ান জুডিশিয়াল কাউন্সিলের এথিক্যাল প্রিন্সিপালের মধ্যেও বিচারকের এমন আচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে একজন যুক্তিসংগত ও অবহিত নাগরিক বিচারকের নিরপেক্ষতার ওপর আস্থা রাখতে পারেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাণিজ্যিক কোচিংয়ে বিচারকের সম্পৃক্ততা নিয়ে আপত্তির যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। একজন বিচারক যদি কোনো কোচিং প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত শিক্ষক, ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর বা প্রচারণার মুখ হন, তাহলে তাঁর বিচারক পরিচয়টি ওই প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক মূল্য বাড়াতে ব্যবহৃত হতে পারে। এতে প্রশ্ন উঠতে পারে—বিচারকের পদমর্যাদা কি ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে? আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, মালিক, শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে কোনো মামলার সঙ্গে যুক্ত হলে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রকৃত পক্ষপাত না থাকলেও 'পক্ষপাতের ধারণা' সৃষ্টি হওয়া বিচার বিভাগের জন্য কম গুরুতর বিষয় নয়। কিন্তু বিপরীত যুক্তিটিও উপেক্ষা করা যায় না। একজন বিচারক কেবল রায় প্রদানকারী ব্যক্তি নন; তিনি একজন আইনজ্ঞ, গবেষক ও শিক্ষকও হতে পারেন। তাঁর দীর্ঘদিনের অর্জিত জ্ঞান যদি সমাজের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ না থাকে, তাহলে বিচার বিভাগের অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর আইনশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। যেটি অপ্রত্যাশিত। তাই 'বাণিজ্যিক কোচিং' এবং 'শিক্ষাদান'কে একই বিষয় হিসেবে দেখা কতটা যুক্তিসংগত, এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। 'কমন ল' দেশগুলোর বিচারিক নৈতিকতার কাঠামোতে এ জায়গাই বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কানাডায় বিচারকদের জন্য মূলনীতি হলো—বিচারিক দায়িত্বের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে অতিরিক্ত (এক্সট্রাজুডিশিয়াল) কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া। কানাডিয়ান জুডিশিয়াল কাউন্সিলের নথিতে বলা হয়েছে, আইন অধ্যয়ন বা আইন শেখানোর মতো 'শিক্ষাগত কার্যক্রম' ঐতিহ্যগতভাবেই বিচারকদের জন্য উপযুক্ত ও মূল্যবান কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যদি তা বিচারিক দায়িত্বে ব্যাঘাত না ঘটায়। একই সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডে স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও বিচার বিভাগের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকলে সীমাবদ্ধতা আরোপের কথাও বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের ভারসাম্য দেখা যায়। সেখানে বিচারকদের বিচারিক দায়িত্বের বাইরে কর্মকাণ্ডের ওপর নৈতিক ও আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে শিক্ষাদানকে একেবারে নিষিদ্ধ করা হয়নি; নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে শিক্ষকতার জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে, যদিও প্রয়োজনীয় পূর্বানুমোদন ও অন্যান্য নৈতিক সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বিচারকদের আইন পেশা পরিচালনা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। অর্থাৎ নীতিটি 'বিচারক কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারবেন না'—এমন সরল নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং কোন কর্মকাণ্ড বিচারিক স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেটিই মূল বিবেচনা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি কিছুটা এভাবেই দেখা যেতে পারে। সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদে আইনের দ্বারা আরোপিত বাধানিষেধ সাপেক্ষে নাগরিকের আইনসংগত পেশা, বৃত্তি, ব্যবসা বা কারবার পরিচালনার অধিকার স্বীকৃত। অবশ্য বিচারকের পদ গ্রহণের সঙ্গে এমন কিছু বিশেষ দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত হয়, যা সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ, বিচারকের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডও অনেক সময় বিচার বিভাগের সামগ্রিক মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। তাই সার্বিক বিবেচনায় মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, 'বিচারক কোচিং করাতে পারবেন কি না' নয়; বরং কোন ধরনের শিক্ষাদান বিচারকের মর্যাদা ও স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কোন ধরনের কর্মকাণ্ড বিচারকের পদকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছে? একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়া, বিচারিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া, গবেষণা করা বা বই লেখা এক ধরনের কর্মকাণ্ড আর কোনো বাণিজ্যিক কোচিং প্রতিষ্ঠানের হয়ে নিয়মিত অর্থের বিনিময়ে ক্লাস নেওয়া, নিজের বিচারক পরিচয়কে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করতে দেওয়া কিংবা প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডমূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বিষয়। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে এই সীমারেখা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কোচিং এখন শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়; ইউটিউব, ফেসবুক, জুম, রেকর্ডেড কোর্স কিংবা সাবস্ক্রিপশন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও বাণিজ্যিক শিক্ষা দেওয়া হয়। নতুন নির্দেশনায় সরাসরি ও ডিজিটাল—উভয় ধরনের প্ল্যাটফর্মের কথা আসা তাই সময়োপযোগী।আমার মনে হয়, বিষয়টিকে 'বাস্তবতানির্ভর' বিবেচনায় রেখে আলোচনা করা উচিত। আমাদের দেশে বিচারকদের অর্জিত বেতন দিয়ে তাঁদের মাসপ্রতি দিনযাপন অত্যন্ত কঠিন। তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বিচারিক কর্মঘণ্টার বাইরে যদি অতিরিক্ত ব্যয়নির্ভর জীবনকে স্বস্তিতে রাখতে কেউ অতিরিক্ত শ্রম ব্যয় করতে চান, তাতে বাধা থাকা উচিত নয়। আবার বাণিজ্যিক কোচিং ব্যবসায় বিচারকের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিষিদ্ধ করাও যুক্তিসংগত। কিন্তু একই সঙ্গে বিচারকদের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, লেখালেখি, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষাদান বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত। প্রয়োজনে পূর্বানুমোদন, আয় প্রকাশ, সময়ের সীমা, প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি এবং বিচারকের পদবি ব্যবহারের ওপর সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। তবে বিচারকের ব্যক্তিগত আয় বা স্বাধীনতার চেয়ে বড় হলো, এটি বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্ন। বিচারককে শুধু নিরপেক্ষ হলে হবে না, তাঁকে নিরপেক্ষ বলেও প্রতীয়মান হতে হবে। আবার বিচারকের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকেও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা সমীচীন হবে না। তাই নীতিটি হতে পারে খুব সহজ, বিচারকের জ্ঞানচর্চা বন্ধ নয়; বিচারকের পদমর্যাদার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ। কোন কর্মকাণ্ড সেই সীমা অতিক্রম করছে, তার সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ সংজ্ঞাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন। মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরান আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট*মতামত লেখকের নিজস্ব
বিচারকদের বাণিজ্যিক কোচিং: নিষেধাজ্ঞা কতটা যৌক্তিক
View on original source
Share
Archive
Like

(0)Comments

 

Related Opinion

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.