দ ন ক নয়

স্বপ্নের ক্যানভাসে রঙ ছড়াতে দ্বিধা ছিল না তার

Image
মীর কাসেম আলী। ছিলেন একজন স্বপ্ন বোনার অভিজ্ঞ কৃষক। প্রতিষ্ঠান গড়ার কারিগর। তাকে বলা যায় পাহাড় কেটে পথ তৈরি করার দুঃসাহসিক অভিযাত্রী। সামনে বিশাল পাহাড়, আড়াল করে রেখেছে নতুন কোনো দিগন্তকে। সেটি দেখে সাধারণ কেউ থমকে যাবে, এটিই স্বাভাবিক। শহীদ মীর কাসেম আলী ছিলেন সাধারণের থেকে আলাদা। তার ছিল বুকভরা সাহস। ছিল কাজ করার অদম্যস্পৃহা। ছিল অফুরান দম। পাহাড়ের পিঠে কিছু পথ তখন কেটে রাখা ছিল। কিন্তু সেই পথগুলোর গন্তব্য কী? তা স্পষ্ট ছিল না। 'বুদ্ধিবৃত্তিক' ওইসব পথ মানুষকে পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবে, নাকি বিভ্রান্তিতে জড়িয়ে ফেলবে, তা-ও জানতেন মীর কাসেম আলী। এ কারণে পাহাড় কেটে নতুন পথ তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। পথটা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ, কাঁটা ছড়ানো। ছিল ঢাল থেকে পিছলে পড়ার ঝুঁকি। তারপরও পাথর ভেঙে, জঙ্গল সাফ করে খুলে দিয়েছিলেন দিগন্ত ছুঁয়ে দেয়ার মতো প্রতিষ্ঠান— নয়া দিগন্ত, দিগন্ত টেলিভিশন। গণমাধ্যমে স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ এবং সার্বভৌম বয়ান তৈরির বাধা হয়ে যে পাহাড় দাঁড়িয়ে ছিল, তিনি ও তার সারথিরা সেটি ভাঙতে শুরু করলেন। প্রথাগত, একমুখী বয়ানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তুলে আনতে চাইলেন প্রকৃত সত্য ও নৈতিক মূল্যবোধ। এ কারণে বিচারিক হত্যার শিকার হতে হয় তাকে। শহীদ মীর কাসেম আলী এখন নেই; কিন্তু সেই মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে আছে নয়া দিগন্ত। প্রোপাগান্ডা আর একপেশে সাংবাদিকতা এখনো আছে, তখনো ছিল; কিন্তু নয়া দিগন্তর মতো একটি বিকল্প, গণমুখী কণ্ঠস্বর তৈরি করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন— সাহস নিয়ে সত্য যদি দাঁড়িয়ে যেতে পারে, এর সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে প্রোপাগান্ডা। শহীদ মীর কাসেম আলী জানতেন, কোনো জাতিকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিতে চাইলে তাদের নিজেদের বয়ান কেড়ে নিতে হয়। একটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষায় গণমাধ্যমকে বলা হয় 'চতুর্থ স্তম্ভ'। এ স্তম্ভের ভূমিকা থাকে প্রতিরক্ষায়ও। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যে দেশ নিজের গল্প নিজে বলতে পারে না, অন্য দেশ তাদের ওপর নিজেদের এজেন্ডা চাপিয়ে দেয়। এডওয়ার্ড সাঈদের অরিয়েন্টালিজম বা নোয়াম চমস্কির 'ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট' তত্ত্বের দিকে তাকালে দেখা যাবে, শক্তিশালী পক্ষগুলো তাদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম দিয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর তকমা চাপিয়ে দিচ্ছে। দুর্বলের বৈচিত্র্যময় চিন্তাধারাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে নিজেদের সুবিধামতো। পশ্চিমা গণমাধ্যমের চোখে মাধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বরাজনীতি ছিল একরকম। কিন্তু কাতারে আলজাজিরার মতো প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বগণমাধ্যমে। একপেশে গণমাধ্যম যখন কোনো সত্যকে চেপে যেতে চায়, আলজাজিরার পর্দায় সেটি উঠে আসে। এতে অনেক ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট গণমাধ্যমগুলোরও সত্য এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। বাংলাদেশও একমুখী তথ্য ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, এখনো দাঁড়িয়ে আছে। দেশীয় গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ কোনো গোষ্ঠী বা চিন্তাধারার প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, সাধারণ মানুষের ধর্মীয়, নৈতিক ও জাতীয় মূল্যবোধকে ধামাচাপা দেয়া হতো। সেই সঙ্কটের ভেতর থেকে ২০০৪ সালে বাতিঘর হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় নয়া দিগন্ত। কিভাবে জ্বলে উঠেছিল এই বাতি? এর পেছনে ছিল তার সারথি প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিকদের পরিকল্পনা আর শহীদ মীর কাসেম আলীর অনুপ্রেরণা। মীর কাসেম আলীর একটি গুণ ছিল— জাতীয় স্বার্থে বা জনকল্যাণে তৈরি যেকোনো দূরদর্শী ও ইতিবাচক পরিকল্পনা তার কাছে উপস্থাপন করা হলে বিমুখ হতে হতো না। তিনি স্বপ্নের ক্যানভাস দেখলে সেখানে রঙ ছড়াতে দ্বিধা করতেন না। নয়া দিগন্তর নেপথ্যেও ছিল তেমনি এক গল্প। তার সামনে যখন পরিকল্পনা হাজির করা হলো, তিনি এতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দ্বিধা বা দীর্ঘসূত্রতা ছাড়া সব ধরনের ঝুঁকি তুলে নিয়েছিলেন কাঁধে। পরিকল্পনা বাস্তব করতে নিজেকে ঢেলে দিয়েছেন অকাতরে। তিনি জানতেন, একটি স্বাধীন ও অপ্রিয় সত্য প্রকাশকারী গণমাধ্যমকে কোনো সুবিধাভোগী গোষ্ঠী পৃষ্ঠপোষকতা দেবে না। এ কারণে গণমাধ্যমকে স্বাবলম্বী করতে বিশাল অর্থনৈতিক সাপোর্টিং মডেল তৈরি করেন। গণমাধ্যমকে যেন কোনো স্বার্থগোষ্ঠীর করুণার ওপর নির্ভর করতে না হয়, সে জন্য এর পেছনে দাঁড় করিয়ে দেন অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার শক্ত প্রাচীর। পত্রিকা প্রকাশের সাথে যোগ হয়েছিল ছাপাখানার উদ্যোগ, একটি কাগজকল প্রতিষ্ঠাসহ আরো আয়োজন। শহীদ মীর কাসেম আলীর ছিল দূরদৃষ্টি। এ কারণে গণমাধ্যমে তার উদ্যোগ ছিল নানামুখী। তিনি যখন নয়া দিগন্তের সূচনা করেন, তখন একমুখী আধিপত্য ভাঙা ছিল দুঃসাহসিক কাজ। অল্প সময়ের মধ্যে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও বিশ্লেষণী কলামের মাধ্যমে নয়া দিগন্ত দেশের পাঠকপ্রিয় ও প্রভাবশালী দৈনিকে পরিণত হয়। একপক্ষীয় বয়ানের বাইরে পেশাদার সাংবাদিকতা এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসে 'দিগন্ত টিভি', যা রাতারাতি লাখ লাখ দর্শকের আস্থা অর্জন করে। উদ্যোগ ছিল 'এশিয়া পোস্ট' নামে একটি ইংরেজি দৈনিক নিয়েও। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কণ্ঠ পৌঁছে দেয়া ছিল এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। নতুন সাংবাদিক তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল মীর কাসেম আলীর। ছিল সংবাদ ও গণমাধ্যম নিয়ে গবেষণার উদ্যোগও। সেই ২০০৯ সালে ডিজিটাল মিডিয়ার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন মীর কাসেম আলী। তিনি বেঁচে থাকলে সবগুলো উদ্যোগ হয়তো এখন থোকায় থোকায় সাজানো থাকত। কারণ তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন, সোনা ফলিয়েছেন। তার নেতৃত্ব ছিল গতিশীল, সৃষ্টিশীল এবং অনন্য। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্ঞান ও বিজ্ঞানে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন শহীদ মীর কাসেম আলী ও তার সারথিরা। বাংলাদেশের ইতিহাসে মীর কাসেম আলী এমন অনন্য চরিত্র, যিনি একাধারে ছিলেন মিডিয়া-উদ্যোক্তা, জনকল্যাণমুখী সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর উদ্ভাবক। আন্তর্জাতিক পরিসরের মানবিক কর্মী। কিন্তু তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল মানবতাবিরোধী কল্পকাহিনী। তার সাথে করা হয়েছে অমানবিক আচরণ। মানবতাবাদী দর্শনে তিনি ছিলেন নক্ষত্রসম। ১৯৭৮ সালে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা 'রাবেতা আল-আলম আল ইসলামী'র বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে কাজ শুরু করেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন মিয়ানমারের সামরিক জান্তা লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানকে নির্যাতন করে বাস্তুচ্যুত করে, তখন কক্সবাজার ও টেকনাফের সীমান্তে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে। এই বিপর্যয় নিয়ে দ্বিধায় ছিল আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। মীর কাসেম আলী তার সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন সেখানে। রাবেতার ব্যানারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে জরুরি খাবার দিয়েছেন, চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন, নিরাপদ পানি দিয়েছেন। পরে শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছিলেন। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান নির্বিশেষে পীড়িতদের সেবায় কাজ করেছেন। সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে মানসম্পন্ন ও নৈতিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে মীর কাসেম আলী ও তার সারথিরা 'ইবনে সিনা' প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশের স্বাস্থ্য খাতের মহীরুহ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। শোষণমুক্ত ও সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থার স্বপ্ন নিয়ে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা ছিল তার। তিনি আইবিডব্লিউএফ, কেয়ারি লিমিটেড, ফুয়াদ আল খতিব ফাউন্ডেশন, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজসহ দেশ-বিদেশে ৪০টির মতো গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। মীর কাসেম আলী যে স্বাধীন বয়ান, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং মিডিয়ার শক্তিশালী প্রাচীর গড়ে তুলেছিলেন— সেটি দেশবিরোধী গোষ্ঠী ও ফ্যাসিবাদী রেজিমের আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই আতঙ্ক থেকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে তারা। ২০১২ সালের ১৭ জুন তাকে গ্রেফতার করা হয়। কাল্পনিক অভিযোগ সাজিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রহসনমূলক বিচারপ্রক্রিয়া চালানো হয়। এ বিচারে আইনি কাঠামোর চরম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিবাদ ওঠে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পর্যবেক্ষণে জানায়, মীর কাসেম আলীর বিচার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। 'অভিযুক্ত'কে আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যূনতম সুযোগ দেয়া হয়নি। বিচারপ্রক্রিয়ার চরম ত্রুটি তুলে ধরে অবিলম্বে সাজা বাতিলের দাবি জানায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। শুনানির ঠিক দুই সপ্তাহ আগে (৯ আগস্ট ২০১৬) মীর কাসেম আলীর ছোট ছেলে ও তার অন্যতম আইনজীবী ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেমকে (আরমান) আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে তুলে নিয়ে গুম করা হয়। জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞরা (অ্যালাইনেস ক্যালামার্ড, মনিকা পিন্টোসহ কয়েকজন) এই গুমের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাকে ফেরত দেয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু সব আইনি যুক্তি ও আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে রাজনৈতিক নির্দেশে ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কাশিমপুর কারাগারে দূর দেখতে পাওয়া এই মানুষটিকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে মীর কাসেম আলীর পদক্ষেপে দ্বিধা ছিল না। মুখে ছিল না ভীতি। তিনি জানতেন, ঘাতকের দড়ি তার নশ্বর শরীর স্পর্শ করবে, স্বপ্নের বীজ ধ্বংস করতে পারবে না। মীর কাসেম আলীকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল; কিন্তু এখন তিনি ইতিহাসের অংশ। তিনি বেঁচে আছেন, থাকবেন— চিরন্তন বাতিঘরে। লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত [email protected]
স্বপ্নের ক্যানভাসে রঙ ছড়াতে দ্বিধা ছিল না তার
View on original source
Share
Archive
Like

(0)Comments

 

Related Opinion

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.