সম

সমীরণ বিশ্বাস

নেপালে মানবিক বিপর্যয়

Image
বন্যায় ভেসে গেছে জীবন, মরদেহেরও নেই জায়গা, প্রকৃতির এই নির্মম বার্তা কি আমরা শুনব? হিমালয়ের দেশ নেপাল। বরফে ঢাকা পাহাড়, আঁকাবাঁকা নদী, সবুজ উপত্যকা আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের জন্য যে দেশটি পৃথিবীর মানুষের কাছে এক স্বপ্নের ভূখণ্ড, সেই নেপালই আজ এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ২৬ আগস্ট ২০২৬। একটা দিন, যা হাজার হাজার মানুষের জীবনে স্বাভাবিক সময়ে শেষদিন হয়ে থাকবে। হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ও শিলার বিশাল ধসের পর সৃষ্ট আকস্মিক জলপ্রবাহ ভেঙে দিয়েছে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ। ভুটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় নেমে এসেছে ভয়াবহ বন্যা। মুহূর্তের মধ্যে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহন, আর সবচেয়ে নির্মমভাবে, মানুষের জীবন। কেউ ছিলেন ঘুমিয়ে। কেউ কর্মস্থলে। কেউ নদীর পাশে বসতবাড়িতে। কেউ বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজে। কেউ হয়তো পথ চলছিলেন। প্রকৃতির সেই আকস্মিক আঘাতের সামনে তাদের হাতে ছিল না প্রস্তুতির সময়, ছিল না পালানোর সুযোগ। একটি নদী যখন হঠাৎ মৃত্যুর স্রোতে পরিণত হয়, তখন মানুষ তার শক্তি দিয়ে কতটুকুই বা প্রতিরোধ করতে পারে? আজ নেপালের বহু পরিবার সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। কারও বাবা নেই। কারও মা, কারও সন্তান, স্বামী বা স্ত্রী নিখোঁজ। কেউ জানেন না প্রিয় মানুষটি বেঁচে আছেন, নাকি কোনো অচেনা নদীর তলদেশে, কোনো পাহাড়ি খাদে কিংবা কাদামাটির নিচে চাপা পড়ে আছেন। আর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বাস্তবতা, অনেক পরিবার এখনো তাদের প্রিয়জনের মরদেহটুকুও ফিরে পায়নি। মানবিক বিপর্যয় প্রথম দিকে যখন ৫৪৭টি মরদেহ উদ্ধারের খবর আসে, তখনই বোঝা গিয়েছিল বিপর্যয়ের ভয়াবহতা কতটা গভীর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ধীরে ধীর তা বাড়তে থাকে, একদিকে মৃত আরেকদিকে নিখোঁজ, যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এদের মধ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও নিরাপত্তাকর্মীরাও রয়েছেন। সংখ্যাগুলো আমাদের কাছে পরিসংখ্যান। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার। একজন নিখোঁজ মানে একটি পরিবারের অপেক্ষা। একটি মরদেহ মানে একটি পরিবারের স্বপ্নের সমাপ্তি। একটি ভেসে যাওয়া ঘর মানে শুধু ইট-কাঠের ক্ষতি নয়, সেখানে হয়তো ছিল একটি শিশুর বই, একজন মায়ের স্মৃতি, বাবার পুরোনো ছবি, বিয়ের অ্যালবাম, জমির কাগজপত্র কিংবা বহু বছরের সঞ্চয়। দুর্যোগ যখন আসে, তখন সে শুধু মানুষকে হত্যা করে না; সে মানুষের স্মৃতি, নিরাপত্তাবোধ, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং স্বাভাবিক জীবনের ভিত্তিকেও ভেঙে দেয়। মরদেহের বিপর্যয় এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায়গুলোর একটি হলো মরদেহ ব্যবস্থাপনা। ভয়াবহ স্রোতে অনেক মরদেহ মূল দুর্ঘটনাস্থল থেকে বহু দূরে ভেসে গেছে। রাসুয়া ও নুয়াকোটের নিখোঁজদের মরদেহ চিতওয়ান, তানাহুন, নাওয়ালপারাসি ও অন্যান্য দূরবর্তী এলাকায় পাওয়া গেছে। ফলে একটি পরিবারের প্রিয়জনের সন্ধান করতে হচ্ছে একাধিক জেলা পেরিয়ে। মৃতদেহ উদ্ধারের পরও শেষ হচ্ছে না যন্ত্রণা। কারণ, কাকে শনাক্ত করা হবে? কার মরদেহ কোন পরিবারের? কোন দেহটি ছিল কার বাবার? কোনটি কার সন্তানের? কোনটি সেই মানুষ, যার জন্য একটি পরিবার দিনের পর দিন অপেক্ষা করছে? বন্যার পানিতে অনেক মরদেহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও দেহাবশেষ পাওয়া গেছে, কোথাও পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতাল ও মর্গের সক্ষমতাও দ্রুত অতিক্রম করেছে মরদেহের সংখ্যা। নেপালের হাসপাতালগুলোয় সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬০০ মরদেহ রাখার সক্ষমতা থাকলেও দুর্যোগের পর উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা তার অনেক বেশি হয়ে যায়। ফলে অজ্ঞাত ও দাবিহীন মরদেহ ব্যবস্থাপনার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। ভাবা যায়? একজন মানুষ জীবিত থাকতে একটি পরিচয় নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন। তার একটি নাম ছিল। পরিবার ছিল। ঠিকানা ছিল। সম্পর্ক ছিল। কিন্তু মৃত্যুর পর সেই মানুষটির পরিচয় নিশ্চিত করাটাই হয়ে উঠছে আরেকটি যুদ্ধ। নদীর স্রোতে শুধু মানুষ নয়, পরিচয়ও ভেসে গেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে নির্মম দিক এখানেই। জীবিত মানুষকে উদ্ধার করা যায়। ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করা যায়। রাস্তা ও সেতু আবার বানানো যায়। বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনর্গঠন করা যায়। কিন্তু একজন মৃত মানুষের পরিচয় যদি হারিয়ে যায়, একটি পরিবার তার শোকেরও পূর্ণ অধিকার পায় না। সে জানে না, যার অপেক্ষায় আছে, তিনি আর ফিরবেন না কি কোনোদিন ফিরে আসবেন। এই অনিশ্চয়তা অনেক সময় মৃত্যুর চেয়েও নির্মম। তাই মরদেহ ব্যবস্থাপনা শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি একটি গভীর মানবিক দায়িত্ব। ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, ছবি ও আঙুলের ছাপ সংরক্ষণ, পোশাক ও ব্যক্তিগত সামগ্রীর রেকর্ড রাখা, মরদেহের অবস্থান ও উদ্ধারস্থল নথিভুক্ত করা, এসব কাজ এখন নেপালের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কারণ আজ যে মরদেহটি অজ্ঞাত, কাল সেটিই হয়তো কোনো মায়ের কাছে তার সন্তানের শেষ পরিচয় হয়ে উঠবে। অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো এই দুর্যোগের আরেকটি হৃদয়বিদারক অধ্যায় হলো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। প্রতিবেদন বলছে, প্রায় ৯০০ কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে। তাদের একটি বড় অংশের বিষয়ে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে তারা ধসে যাওয়া বা পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকতে পারেন। প্রায় ৫০০ জনের মতো শ্রমিক সুড়ঙ্গে আটকে থাকার আশঙ্কার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। এখানেই মানবিক আশার শেষ আলোটি এখনো জ্বলছে। কারণ সুড়ঙ্গের ভেতরে কোথাও যদি বাতাসের প্রকোষ্ঠ থেকে থাকে, যদি কোনো অংশ অক্ষত থাকে, যদি কেউ এখনো বেঁচে থাকেন, তাহলে প্রতিটি মিনিট মূল্যবান। এই কারণেই বিশেষ উদ্ধারকারী দল, ভারী যন্ত্রপাতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত, চীন ও অন্যান্য দেশের বিশেষজ্ঞ সহায়তাও উদ্ধার প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়েছে। একটি পরিবারের কাছে এই ৯০০ মানুষ কোনো সংখ্যা নয়। প্রতিটি একজন প্রিয় মানুষ। একজন বাবা, ভাই, স্বামী, সন্তান। একজন বন্ধুর অপেক্ষায় থাকা আরেকজন মানুষ। তাই উদ্ধারকাজের প্রতিটি মুহূর্তকে মানবিক মর্যাদার সঙ্গে দেখতে হবে। ভেসে গেছে সারাজীবনের স্মৃতি দুর্যোগে একটি ঘর ধ্বংস হওয়া মানে শুধু একটি স্থাপনা ধ্বংস হওয়া নয়। একটি ঘরের সঙ্গে ধ্বংস হয় মানুষের নিরাপত্তার অনুভূতি। একটি শিশুর কাছে তার ঘর ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। একজন বৃদ্ধের কাছে সেটি ছিল সারাজীবনের স্মৃতি। একজন কৃষকের কাছে ঘর ছিল তার জমি, গবাদিপশু, বীজ, খাদ্য ও ভবিষ্যৎ। একজন শ্রমিকের কাছে ঘর ছিল দীর্ঘ দিনের পর ফিরে আসার আশ্রয়। বন্যা যখন সেই ঘরটি ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তখন মানুষ শুধু গৃহহীন হয় না, সে তার পরিচিত পৃথিবীটাকেই হারিয়ে ফেলে। আজ নেপালের বহু মানুষ খোলা আকাশের নিচে, অস্থায়ী আশ্রয়ে কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের প্রয়োজন শুধু খাবার নয়। প্রয়োজন নিরাপদ পানি, চিকিৎসা, পোশাক, স্যানিটেশন, শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, নারী ও বয়স্কদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, মানসিক সহায়তা। দুর্যোগের পর শুরু হয় আরেক দুর্যোগ। বন্যা থেমে গেলে দুর্যোগ শেষ হয়, এমন ধারণা ভুল। বরং অনেক ক্ষেত্রে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়ের মানবিক বিপর্যয়। দূষিত পানি থেকে রোগ ছড়াতে পারে। পচা মরদেহ ও প্রাণীর দেহ থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। ধ্বংস হওয়া স্যানিটেশন ব্যবস্থা মহামারি তৈরি করতে পারে। শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক, ভয়, ঘুমের সমস্যা ও মানসিক ট্রমা তৈরি হতে পারে। পরিবার হারানো মানুষ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সংকটে পড়তে পারেন। জীবিকা হারানো মানুষ ঋণের বোঝায় পড়তে পারেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কৃষিজমি ও পশুসম্পদ নষ্ট হলে গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়তে পারে। অর্থাৎ, বন্যার পানি সরে গেলেও তার ক্ষত বহু বছর ধরে থেকে যেতে পারে। এটা কি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ? এই প্রশ্নটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক ট্রিগার ছিল হিমালয় অঞ্চলের বরফ ও শিলার ধস এবং তার পরবর্তী আকস্মিক জলপ্রবাহ। কিন্তু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা কীভাবে এত বড় মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়, তার উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে। হিমালয় আজ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। তাপমাত্রা বাড়ছে। হিমবাহ পরিবর্তিত হচ্ছে। বরফ ও তুষারের স্থিতিশীলতা বদলাচ্ছে। পাহাড়ি ঢালের ঝুঁকি বাড়ছে। অতিবৃষ্টি ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, দুর্বল ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি ও স্থাপনা নির্মাণ। অর্থাৎ, প্রকৃতি হয়তো বিপদ তৈরি করে; কিন্তু মানুষের পরিকল্পনার ভুল অনেক সময় সেই বিপদকে দুর্যোগে পরিণত করে। উন্নয়ন বনাম নিরাপত্তা, কোনটি আগে? নেপালের মতো পাহাড়ি দেশে জলবিদ্যুৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক প্রয়োজন। সেতু প্রয়োজন। পর্যটন প্রয়োজন। শিল্প প্রয়োজন। বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উন্নয়নের নামে আমরা কোথায় নির্মাণ করছি? নদীর কতটা কাছে? পাহাড়ের কোন ঢালে? ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে কী ধরনের স্থাপনা? হিমবাহের নিচের উপত্যকায় কী ধরনের অবকাঠামো? বন্যার সম্ভাব্য পথকে আমরা কতটা সম্মান করছি? প্রকৃতির নিয়ম অমান্য করে উন্নয়ন করলে প্রকৃতি একদিন তার মূল্য আদায় করে। তখন সেই মূল্য হয়তো অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা যায় না। প্রকৃতির সঙ্গে বোঝাপড়া প্রকৃতির সীমা বুঝতে হবে। নদীর জায়গা নদীকে দিতে হবে। পাহাড়ের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে। বন রক্ষা করতে হবে। হিমবাহ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর মানুষের জীবনকে উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। প্রতিটি মৃত্যুই একটি মানবিক প্রতিচ্ছবি সংবাদে যখন লেখা হয়, 'এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত', আমরা হয়তো সংখ্যাটি পড়ি এবং পরের সংবাদে চলে যাই। কিন্তু সেই সংখ্যার ভেতর যদি আমরা একজন মানুষকে দেখতে পারি, তখন বিপর্যয়ের অর্থ বদলে যায়। ধরা যাক, একজন বাবা সকালে কাজে বেরিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় তিনি আর ফেরেননি। তার সন্তান দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। মা বলছেন, 'হয়তো আসবে।' কয়েক ঘণ্টা পর সেই আশা বদলে যায় উদ্বেগে। পরদিন উদ্বেগ বদলে যায় আতঙ্কে। কয়েকদিন পর আতঙ্ক বদলে যায় নিঃশব্দ অপেক্ষায়। আর যখন কোথাও একটি অজ্ঞাত মরদেহ পাওয়া যায়, তখন পরিবারের হৃদয়ে নতুন করে ভয় জন্ম নেয়, এটা কি আমাদের মানুষটি? এই অপেক্ষার কোনো পরিসংখ্যান নেই। এই কান্নার কোনো হিসাব নেই। এই শূন্যতার কোনো অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। নিখোঁজ মানুষের পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়। মৃত্যুর সংবাদ মানুষকে কাঁদায়। কিন্তু নিখোঁজের সংবাদ মানুষকে অপেক্ষা করায়। একজন মৃত মানুষের জন্য পরিবার শোক পালন করতে পারে। কিন্তু একজন নিখোঁজ মানুষের জন্য পরিবার প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। ফোনের শব্দ শুনে বুক কেঁপে ওঠে। হয়তো ফোনটি তার। হয়তো কেউ বলবে, তিনি বেঁচে আছেন। এই আশাই তাদের বাঁচিয়ে রাখে। তাই উদ্ধারকাজ শুধু প্রযুক্তিগত অভিযান নয়। এটি হাজার হাজার পরিবারের আশার সঙ্গে যুক্ত একটি মানবিক অভিযান। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন অপরিহার্য। এ ধরনের দুর্যোগ কোনো একটি দেশের একার পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন। বিশেষ করে যখন একই সঙ্গে উদ্ধার, মরদেহ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, খাদ্য, আশ্রয়, যোগাযোগ, অবকাঠামো পুনর্গঠন ও মানসিক সহায়তার প্রয়োজন হয়। মানবিকতা এই মুহূর্তে নেপালের মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবিক সংহতি। যে পরিবার তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। যারা নিখোঁজ, তাদের সন্ধানে সব ধরনের প্রযুক্তি ও মানবিক সম্পদ ব্যবহার করতে হবে। যারা বেঁচে গেছেন কিন্তু ঘর হারিয়েছেন, তাদের নিরাপদ আশ্রয় দিতে হবে। যারা জীবিকা হারিয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুদের আবার স্কুলে ফিরিয়ে নিতে হবে। কৃষক ও শ্রমিকদের জীবিকা পুনর্গঠনের সুযোগ দিতে হবে। আর যারা প্রিয়জনের মরদেহ শনাক্ত করতে পারছেন না, তাদের প্রতি বিশেষ মানবিক সহায়তা দিতে হবে। কারণ দুর্যোগের পর একটি পরিবার শুধু ত্রাণ চায় না। তারা চায় তাদের মানুষটির পরিচয়। তারা চায় শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখতে। তারা চায় মর্যাদার সঙ্গে বিদায় জানাতে। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় আমাদের চোখের সামনে মানবসভ্যতার এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে। প্রকৃতির কাছে মানুষ কতটা অসহায়, তার প্রমাণ আমরা দেখেছি। একটি আকস্মিক বন্যা হাজারও মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। হাজারও মানুষ নিখোঁজ। অসংখ্য পরিবার গৃহহীন। মরদেহ ভেসে গেছে বহু দূরে। মর্গের সক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে মৃতের সংখ্যা। পরিচয়হীন মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে পরিবারগুলো অপেক্ষা করছে। আর পাহাড়ের অন্ধকার সুড়ঙ্গে এখনো হয়তো কেউ বেঁচে থাকার জন্য অপেক্ষা করছেন। এই অপেক্ষার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা থাকতে হবে। এই কান্নার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। কারণ প্রতিটি মৃত্যুই একটি মানবিক প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি নিখোঁজ মানুষ একটি পরিবারের অসমাপ্ত গল্প। প্রতিটি ভেসে যাওয়া ঘর একটি হারিয়ে যাওয়া পৃথিবী। আর প্রতিটি দুর্যোগ আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা কি সেই সতর্কবার্তা শুনব? নাকি পরবর্তী বিপর্যয় পর্যন্ত অপেক্ষা করব? নেপালের নদী আজ শুধু মৃতদেহ বহন করছে না, বহন করছে মানবসভ্যতার প্রতি একটি কঠিন প্রশ্ন। উন্নয়ন কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ উন্নয়নের জন্য? প্রকৃতিকে জয় করাই কি আমাদের লক্ষ্য, নাকি প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করাই বুদ্ধিমানের পথ? উত্তর আমাদেরই দিতে হবে। আজ নেপালের জন্য প্রার্থনা করছি। নিখোঁজদের জন্য আশার আলো জ্বালাচ্ছি। মৃতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। স্বজনহারা পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আর যারা বেঁচে আছেন, তাদের পুনর্গঠনের জন্য মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি। কারণ দুর্যোগের সময় মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আর প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, প্রকৃতির সঙ্গে টিকে থাকার বোঝাপড়াই হোক আগামী দিনের পথ। নেপাল আজ কাঁদছে। দক্ষিণ এশিয়াকে সেই কান্না শুনতে হবে। কারণ এই কান্নার মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা। সমীরণ বিশ্বাস : পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
নেপালে মানবিক বিপর্যয়
View on original source
Share
Archive
Like

(0)Comments

 

Related Opinion

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.