রূ

রূপালী ডেস্ক

প্রবাসীদের আয়ই কি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি

Image
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হলেই অনেকে রেমিট্যান্সের কথা সামনে আনেন। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার, রিজার্ভ, আমদানি সক্ষমতা এবং লাখ লাখ পরিবারের জীবনযাত্রার ভূমিকাটি গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কাতারে চলে আসে। তবে, প্রবাসী রেমিট্যান্সের এসব সমীকরণ একেবারেই ভিত্তিহীনÑএটা বলার যেমন অবকাশ নেই, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ আয়ের ভূমিকাকে পেছনে ফেলে দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রেমিট্যান্সের প্রবাহে নতুন নতুন রেকর্ডও তৈরি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই প্রবাহ বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এই দুটি পরিসংখ্যান পাশাপাশি রাখলেই বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। রেমিট্যান্স যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, এটিকে গোটা বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে একই ওজনে মাপা ঠিক-বেঠিকের প্রশ্ন থেকে যায়; বরং এটি বৃহত্তর অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে সহায়তা করা বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ বললে সঠিক মানদ- থাকে। বিশ্বব্যাংক এবং এনবিআরের সমীকরণ অনুযায়ী, দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক কর্মকা-ই বাংলাদেশের বড় ভিত্তি, আর রেমিট্যান্স হচ্ছে তারই একটি সহায়ক অর্থ। সুতরাং রেমিট্যান্স এবং দেশজ উৎপাদন জিডিপিকে একই ধরনের বিষয় মনে করার সুযোগ থাকে না। তবে এ ক্ষেত্রে রাজস্ব আয় এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের মধ্যে একটা তুলনামূলক সম্পর্ক রয়ে যায়, সে হিসেবে রাজস্ব আয়ের সঙ্গে রেমিট্যান্সের তুলনা করলে দেখা যাবে, সরকারের রাজস্ব আয়ের পরিমাণই বেশি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, দেশজ উৎপাদন এউচ-তে সেবা খাতের অবদান সবচেয়ে বড়; এর পরেই রয়েছে শিল্প ও কৃষি। ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বিশাল অংশ তৈরি হয় দেশের সীমানার গ-ির ভেতরেই। সর্বশেষ হিসাবেও এউচ-এর বর্তমান মূল্যের আকার ৬১ লাখ কোটি টাকার বেশি। আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে, এউচ এবং সরকারের রাজস্ব এক বিষয় নয়। এউচ হচ্ছে দেশে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট মূল্য; এ কারণেই এটিকে দেশজ উপাদান হিসেবে বলা হয়ে থাকে, আর রাজস্ব হচ্ছে সরকারের হাতে আসা অর্থ। কিন্তু এউচ-এর আকার যত বড় হয় এবং দেশের ভেতরে যত বেশি উৎপাদন, আয়, ভোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য হয়, সরকারের করভিত্তি তত বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই সমীকরণে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব আয় প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি, যেটিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে যাবে বলে মনে করা হয়। আরও সহজভাবে বলতে গেলে, রেমিট্যান্স হলো বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের উপার্জনের একটি অংশ, যা তারা দেশে পাঠান। আর দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হলো, দেশের কোটি কোটি মানুষের সম্মিলিত অর্থনৈতিক কর্মকা-ের ফল। তাই রেমিট্যান্সকে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি বাংলাদেশের বৃহত্তর অর্থনীতিকে সহায়তা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক প্রবাহ। একজন প্রবাসী দেশে ১ লাখ টাকা পাঠালে সেই টাকা সরকারের কোষাগারে ১ লাখ টাকা হিসেবে জমা হয় না। সেটি যায় তার পরিবার বা নির্দিষ্ট প্রাপকের কাছে। পরে সেই অর্থ যখন দেশে পণ্য ও সেবা কেনার পেছনে ব্যয় হয়, তখন অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে এবং সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে ঠঅঞ, আয়কর বা অন্যান্য করের মাধ্যমে সরকার রাজস্ব পেতে পারে; অর্থাৎ রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে অর্থ জোগায়, কিন্তু অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও করব্যবস্থা রাষ্ট্রের নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা তৈরি করে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি হওয়া উচিত নাÑরেমিট্যান্স বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি? বরং প্রশ্ন হওয়া উচিতÑকীভাবে রেমিট্যান্সের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা যায়? প্রবাসীরা যে অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন, তার একটি অংশ যদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা বাড়ায়, শিল্পে বিনিয়োগ হয় কিংবা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, তাহলে রেমিট্যান্স দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির শক্তি বাড়ানোর একটি হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের আয় বাড়বে, ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে, ভোগ বাড়বে এবং সরকারের করভিত্তিও বিস্তৃত হবে। এই দুই শক্তিকে তাই পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় অর্জন হলোÑদেশের অভ্যন্তরে একটি বিশাল উৎপাদন ও সেবা অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। কৃষি থেকে শিল্প, পোশাক থেকে ওষুধ, নির্মাণ থেকে পরিবহন, ব্যাংকিং থেকে তথ্যপ্রযুক্তিÑবহু খাতের সম্মিলিত কর্মকা-ই আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি। রেমিট্যান্স সেই অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক জ্বালানি সরবরাহ করে। কিন্তু পুরো অর্থনীতির পুঁজিটি দেশের ভেতরেই চলমান। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা; কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতির আসল ভিত্তি বাংলাদেশের মানুষের নিজেদের উৎপাদন, শ্রম, ব্যবসা ও সেবা। সুতরাং রেমিট্যান্সের রেকর্ডের গল্পের পাশাপাশি বাংলাদেশের আরও বড় গল্পটি বলা জরুরিÑ৬১ লাখ কোটি টাকার বেশি আকারের যে অর্থনীতি দেশের ভেতরে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের শ্রম ও কর্মকা-ে তৈরি হচ্ছে, সেটিই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি। এই দুই অর্থনীতিকে একত্র করে রাষ্ট্র যদি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের দৌড়গড়ায় পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাষ্ট্র যেমন তার সীমানার ভেতরে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস তৈরি করে, ঠিক তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ প্রবাসীর ক্ষেত্রেও যদি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণে আরও পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ করত এবং বিদেশের মাটিতে তাদের আইনি জটিলতার ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর হস্তক্ষেপ করত, তাহলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হতো। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আয় ও বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের মধ্যে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর সামঞ্জস্য তৈরি হতে পারত। একজন প্রবাসীকে শুধু বাংলাদেশের সীমানা পার করে দেওয়া, নামকাওয়াস্তে তিন দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া এবং এরপর তার কাছ থেকে কাক্সিক্ষত মাত্রার অর্থনৈতিক অবদান আশা করা অনেকটাই দুরাশার শামিল; বরং প্রবাসীদের মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে তাদের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা গেলে তার সুফল ব্যক্তি, পরিবার এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রÑতিন পক্ষই পেতে পারত। বার্তা প্রেরক মোহাম্মদ সানাউল হক ফিচার সাংবাদিক
প্রবাসীদের আয়ই কি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
View on original source
Share
Archive
Like

(0)Comments

 

Related Opinion

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.