ছবি- রূপালী বাংলাদেশ
একটি পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার দৃশ্য যেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। ব্যস্ত জীবন, প্রযুক্তিনির্ভরতা, মোবাইল ফোন ও টেলিভিশনে অতিরিক্ত আসক্তির কারণে একই ঘরে থেকেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারের খাবার টেবিল হতে পারে শিশুর নৈতিকতা, শিষ্টাচার, মূল্যবোধ ও যোগাযোগ দক্ষতা শেখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
একসঙ্গে খাওয়া মানে শুধু খাবার গ্রহণ নয়; এটি পরিবারের সদস্যদের কথা বলা, একে অন্যের কথা শোনা, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া এবং পারস্পরিক ভালোবাসা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রতিদিন অন্তত একবার পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খেতে পারলে শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
শিশুর জন্য খাবার টেবিল একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারে। সেখানে সে নিজের কথা বলতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং দিনের নানা অভিজ্ঞতা পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে। বড়রা যখন নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা বা কোনো সমস্যার কথা বলেন, তখন শিশুও বাস্তব জীবন সম্পর্কে ধারণা পায়। এভাবেই আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে পরিবার থেকেই গড়ে ওঠে তার মূল্যবোধ ও চরিত্র।
খাবার টেবিলের স্বাভাবিক কথোপকথন শিশুর ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করতে করতে শিশু নতুন শব্দ শেখে, নিজের মতামত প্রকাশ করতে শেখে এবং অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস গড়ে তোলে। একই সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা বা মতভেদ হলে কীভাবে যুক্তি দিয়ে কথা বলতে হয়, সেটিও শেখে।
বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা, কোচিং, অ্যাসাইনমেন্ট ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত। ভালো ফলাফল করার চাপও অনেক শিশুকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের খাবার টেবিল হতে পারে তাদের জন্য একটি চাপমুক্ত জায়গা। সেখানে নম্বর, ফলাফল বা অন্য কারও সঙ্গে তুলনার বদলে তারা পেতে পারে পরিবারের ভালোবাসা, মানসিক সমর্থন ও স্বস্তি।
একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস শিশুদের মধ্যে ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার মতো গুণও তৈরি করতে পারে। কখন কথা বলতে হবে, কখন অন্যের কথা শুনতে হবে, কীভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতে হবে—এসব সামাজিক আচরণ শিশুরা পরিবারের পরিবেশ থেকেই শিখে নেয়।
জীবনে অনেক মানুষ মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও নিজের চিন্তা বা বক্তব্য সঠিকভাবে প্রকাশ করতে না পারায় পিছিয়ে পড়ে। ছোটবেলা থেকেই যদি একটি শিশু পরিবারের নিরাপদ পরিবেশে নিজের কথা বলার সুযোগ পায়, তাহলে তার আত্মবিশ্বাস ও চিন্তা গুছিয়ে প্রকাশ করার সক্ষমতা বাড়ে। ভবিষ্যতে পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশন কিংবা চাকরির সাক্ষাৎকারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাই ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে খাওয়ার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা প্রয়োজন। প্রতিদিন সম্ভব না হলে সপ্তাহে অন্তত কয়েকদিন মোবাইল ফোন ও টেলিভিশন দূরে রেখে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে খাবার খেতে পারেন। কারণ একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকেই। আর সেই শিক্ষার অন্যতম সুন্দর ও কার্যকর জায়গা হতে পারে পরিবারের খাবার টেবিল।
লেখক: একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর, আল ইহসান একাডেমি, খিলক্ষেত, ঢাকা
(0)Comments