রূ

রূপালী ডেস্ক

রেমিট্যান্স : অর্থনীতির শক্তি ও উন্নয়নের অদৃশ্য চালিকাশক্তি

Image
ড. মো. মিজানুর রহমান। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অথচ অনেকাংশে অদৃশ্য চালিকাশক্তি হলো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস নয়; লাখ লাখ রেমিট্যান্সযোদ্ধার পরিবারের জীবিকা, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রধান অবলম্বন। জাতীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী—বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, আমদানি সক্ষমতা, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য, রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে রেমিট্যান্স সরাসরি যুক্ত। পোশাক রপ্তানি যেখানে পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, রেমিট্যান্স সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের শ্রম, দক্ষতা, ত্যাগ ও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার সরাসরি অর্থনৈতিক প্রতিফলন। তাই রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির যেমন 'নীরব শক্তি', তেমনি অসংখ্য পরিবারের জীবনরেখা। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রেমিট্যান্সের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তী পাঁচ দশকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের ফলে রেমিট্যান্স কয়েক কোটি ডলারের প্রাথমিক পর্যায় থেকে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে রেকর্ড প্রায় ৩৬ বিলিয়ন ডলারের শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই অগ্রযাত্রা কোনো একক সময় বা সরকারের অর্জন নয়; এর পেছনে রয়েছে প্রবাসী কর্মীদের দীর্ঘদিনের শ্রম ও ত্যাগ, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন সময়ের সরকারি নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। তবে রেমিট্যান্সের এই অগ্রযাত্রা সবসময় মসৃণ ছিল না। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তন, উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, বিনিময় হার, ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তরব্যবস্থা বিভিন্ন সময়ে বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও এসব চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বিভিন্ন সংস্কার, বৈধ চ্যানেলকে অধিক কার্যকর করা এবং প্রবাসীদের আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহকে পুনরায় গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমান সরকারও সেই ইতিবাচক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে প্রবাসী আয়কে অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। রেমিট্যান্সের প্রকৃত সম্ভাবনা কেবল কত ডলার দেশে আসে তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর একটি অংশ যদি সঞ্চয়, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিল্পায়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে যুক্ত করা যায়, তাহলে প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি পুঁজিতে পরিণত হতে পারে। সেই অর্থে রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ নয়—এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ, রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের পরিবারের জীবনরেখা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের এক বিশাল সম্ভাবনার ভিত্তি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রেমিট্যান্সে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অবশ্যই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন বাস্তবতা। কিন্তু এই বৃদ্ধিকে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করাও অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট নয়। বৈদেশিক মুদ্রার তুলনামূলক বাস্তবসম্মত বিনিময় হার, ব্যাংকিং চ্যানেলে আকর্ষণীয় ডলার দর, সরকারি ২ দশিমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা এবং হুন্ডি নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন নীতিগত ও বাজারগত কারণও বৈধ পথে রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতে হলে পরিবর্তনের আগে ও পরে মাসভিত্তিক রেমিট্যান্স, বিনিময় হার, অভিবাসী কর্মীর সংখ্যা এবং বৈধ ও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের ব্যবহার তুলনা করা অধিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। রেমিট্যান্সের উৎস বিশ্লেষণ করলেও বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়। প্রবাসী আয় এখনো প্রধানত কয়েকটি দেশনির্ভর, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়ার মতো শ্রম ও প্রবাসী-অধ্যুষিত বাজারের ওপর এর বড় অংশ নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় উৎস থেকে প্রবাহ কমেছে। এই পরিবর্তন দেখায় যে রেমিট্যান্সের ভূগোল স্থির নয়; বৈশ্বিক অর্থনীতি, শ্রমবাজার, বিনিময় হার ও প্রবাসীদের আয়-সঞ্চয়ের সক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে এর উৎসও বদলে যায়। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—কোনো দেশ থেকে বেশি রেমিট্যান্স আসা মানেই সেখানে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা বেশি, এমনটি নয়। কর্মীদের আয়, সঞ্চয়ের সক্ষমতা, প্রবাসী জনগোষ্ঠীর স্থায়িত্ব এবং দেশে অর্থ পাঠানোর প্রবণতাও রেমিট্যান্সের পরিমাণ নির্ধারণ করে। ফলে কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন ও উচ্চ-আয়ের শ্রমবাজারে প্রবেশ, দক্ষ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বাজারের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য সৃষ্টি করা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স কৌশলের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কৌশল শুধু বেশি মানুষকে বিদেশে পাঠানো নয়; বরং দক্ষ, উচ্চ আয়ের এবং টেকসই কর্মসংস্থানের জন্য নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ নিশ্চিত করা। ভারত, মেক্সিকো ও ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতা দেখায়, বৃহৎ প্রবাসী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি উচ্চদক্ষ পেশা, পরিকল্পিত বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শক্তিশালী প্রবাসী নেটওয়ার্ক রেমিট্যান্স বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বাংলাদেশেরও মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো উচ্চ-আয়ের বাজারে দক্ষ কর্মীর অংশ বাড়াতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সের দ্রুত প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করেছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, শক্তিশালী রেমিট্যান্স ও অধিক নমনীয় বিনিময় হার বহিঃখাতের চাপ কমাতে এবং রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে। তবে এই সাফল্যকে স্থায়ী নিরাপত্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, তেলের দামের পরিবর্তন কিংবা বিভিন্ন দেশের অভিবাসন নীতির পরিবর্তন রেমিট্যান্সে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বর্তমান প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা, দক্ষ মানবসম্পদ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে বহিঃখাতের একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে হবে। এই ক্ষেত্রে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হুন্ডি। অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ দেশে পৌঁছালেও তা আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে না; ফলে রিজার্ভে বৈদেশিক মুদ্রা যোগ হয় না এবং বৈধ বাজারে ডলারের সরবরাহও কমে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে সিঙ্গাপুর–বাংলাদেশ করিডরে ২০০ ডলার পাঠানোর গড় ব্যয় ছিল প্রায় ১২ শতাংশ এবং মালয়েশিয়া–বাংলাদেশ করিডরে ১২ শতাংশেরও বেশি। তাই হুন্ডি দমনে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; বৈধ চ্যানেলকে দ্রুত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করতে হবে। ডিজিটাল রেমিট্যান্স, মোবাইল আর্থিক সেবা, সহজ পরিচয় যাচাই এবং ব্যাংক ও অর্থ স্থানান্তর প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে এ ব্যয় কমানো সম্ভব। রেমিট্যান্সের ব্যবহারও এর অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানে ব্যয় পরিবারকে দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা করে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে ব্যয় রেমিট্যান্সকে ভবিষ্যৎ মানবসম্পদে রূপান্তর করে। তবে অতিরিক্ত ভোগ, জমি-আবাসনের মূল্য বৃদ্ধি ও আমদানিনির্ভর চাহিদার ঝুঁকি রয়েছে। তাই রেমিট্যান্সনির্ভর পরিবারকে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য, পশুপালন, ক্ষুদ্র শিল্প, উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ভোগনির্ভর অর্থকে উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। বাংলাদেশের শিল্পায়নের অন্যতম সীমাবদ্ধতা দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের ঘাটতি। এ ক্ষেত্রে প্রবাসী সঞ্চয় গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প মূলধন হতে পারে। প্রবাসীরা শুধু অর্থই আনেন না; তারা ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, আন্তর্জাতিক বাজারের ধারণা ও বৈদেশিক নেটওয়ার্কও নিয়ে আসেন। কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়া ও জুতা, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক্স, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্লাস্টিক, জাহাজ নির্মাণ ও স্বাস্থ্যসেবায় এই মূলধন ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। বার্ষিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্সের মাত্র ৫ শতাংশ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে প্রবাহিত করা গেলে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ মূলধন শিল্পায়নে যুক্ত হতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ ও সহজ প্রবাসী বিনিয়োগব্যবস্থা, যেখানে কোম্পানি নিবন্ধন, শিল্প প্লট, কর, অনুমোদন, ব্যাংকিং ও প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে এক জায়গা থেকে সেবা পাওয়া যাবে। তবে এর ভিত্তি হতে হবে আস্থা—বিনিয়োগ সুরক্ষা, স্বচ্ছতা, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি ও প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস ছাড়া প্রবাসী মূলধনের বড় প্রবাহ নিশ্চিত করা কঠিন। রেমিট্যান্সের ভবিষ্যৎ আরও বেশি নির্ভর করবে মানবসম্পদের মানের ওপর। বাংলাদেশকে 'বিদেশে বেশি কর্মী পাঠানো' থেকে 'বিদেশে উচ্চ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি'-র দিকে যেতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্ক পরিচর্যা, নির্মাণ, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, আতিথেয়তা, পরিবহন, জাহাজ পরিচালনা ও কৃষি প্রযুক্তির মতো খাতে দেশভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও ভাষাজ্ঞান নিশ্চিত করা গেলে একই সংখ্যক কর্মী থেকেও বেশি রেমিট্যান্স অর্জন সম্ভব। পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় কমানো জরুরি, কারণ অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে কর্মীর প্রথম কয়েক বছরের আয়ের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে চলে যায়। নির্ধারিত ফি, ডিজিটাল নিয়োগ, নিবন্ধিত এজেন্ট, মধ্যস্বত্বভোগীদের জবাবদিহি ও কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রেমিট্যান্সের ভৌগোলিক ও পেশাগত বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভূরাজনৈতিক সংঘাত, অর্থনৈতিক মন্দা বা অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ায়। আবার প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারে নিম্নদক্ষ কাজের চাহিদা কমতে পারে। তাই বিদেশে কর্মসংস্থানকে শুধু শ্রম রপ্তানি হিসেবে না দেখে দক্ষতা, প্রযুক্তি, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ দেশে ফিরিয়ে আনার একটি অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত করতে হবে। নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্য, পরিচর্যা ও সেবামূলক পেশায় সম্ভাবনা রয়েছে; তবে নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, শ্রম অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩৬ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড রেমিট্যান্সের পর ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হলেও তা শুধু আরও বেশি মানুষ বিদেশে পাঠিয়ে অর্জন করা উচিত নয়। বাংলাদেশের কৌশল হতে হবে 'পরিমাণ' থেকে 'গুণগত মান'-এ রূপান্তর—দক্ষতা বৃদ্ধি, উচ্চ মজুরি, কম অভিবাসন ব্যয়, বৈচিত্র্যময় শ্রমবাজার, সাশ্রয়ী অর্থ স্থানান্তর এবং প্রবাসী বিনিয়োগ। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত ও কম খরচে অর্থ পাঠানো এবং সুকুক, প্রবাসী বন্ড ও অন্যান্য উৎপাদনশীল বিনিয়োগ পণ্যের মাধ্যমে প্রবাসী সঞ্চয়কে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনে রূপান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। এভাবেই রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ নয়, বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে। রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলেও এটিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। এটি বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমায়, লাখ লাখ পরিবারকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেয়, দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়তা করে এবং সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে; কিন্তু টেকসই সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে উঠবে দেশীয় উৎপাদন, শিল্পায়ন, রপ্তানি, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও বিনিয়োগের ওপর। তাই রেমিট্যান্সের সাফল্য শুধু দেশে কত ডলার এসেছে, তা দিয়ে নয়; বরং কত দক্ষ কর্মী তৈরি হয়েছে, শ্রমিকপ্রতি আয় কত বেড়েছে, অভিবাসন ব্যয় কতটা কমেছে, বৈধ পথে অর্থপ্রবাহ কতটা বেড়েছে এবং সেই অর্থের কত অংশ উৎপাদনশীল কাজে রূপান্তরিত হয়েছে—তা দিয়েই বিচার করা উচিত। বাংলাদেশের সামনে এখন রেমিট্যান্স ব্যবস্থাকে একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেলে রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে। অদক্ষ শ্রম থেকে দক্ষ শ্রমে, ব্যয়বহুল অভিবাসন থেকে সাশ্রয়ী অভিবাসনে, সীমিত শ্রমবাজার থেকে বৈচিত্র্যময় বৈশ্বিক শ্রমবাজারে এবং প্রবাসী আয় থেকে প্রবাসী পুঁজিতে এই রূপান্তর ঘটাতে পারলে রেমিট্যান্স দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কত বিলিয়ন ডলার দেশে আসছে—তা নয়; প্রশ্ন হলো, সেই অর্থ দিয়ে আমরা কী তৈরি করছি। রেমিট্যান্স যদি প্রধানত ভোগে ব্যয় হয়, তা বর্তমানকে স্বস্তি দেবে; আর যদি এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষা, দক্ষতা, সঞ্চয়, উদ্যোক্তা, শিল্প, প্রযুক্তি ও উৎপাদনে বিনিয়োগ করা যায়, তবে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করবে। তাই বাংলাদেশের আগামী দিনের রেমিট্যান্স নীতির মূল দর্শন হওয়া উচিত—প্রবাসী আয়কে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ হিসেবে নয়, জাতীয় উন্নয়নের মূলধন হিসেবে দেখা। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই রেমিট্যান্সকে সাময়িক স্বস্তির উৎস থেকে টেকসই, উৎপাদনশীল ও প্রবাসী-সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তিতে পরিণত করতে পারে। লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
রেমিট্যান্স : অর্থনীতির শক্তি ও উন্নয়নের অদৃশ্য চালিকাশক্তি
View on original source
Share
Archive
Like

(0)Comments

 

Related Opinion

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.