সহ

সহুল আহমদ

মক্কা চুক্তিতে গেলে আমাদের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যস্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে

Image
'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি' স্বাক্ষরিত হওয়ার পেছনে কোন বৈশ্বিক বাস্তবতা কাজ করেছে? এম হুমায়ুন কবির: মক্কা চুক্তির ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। এর তাৎক্ষণিক কারণ হলো বর্তমান ইরান সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কার্যক্রমের ফলে সৃষ্ট 'নিরাপত্তাশূন্যতা'। ইরান বিপ্লবের পর মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে চাপে রাখতে মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতৃত্বে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে একটি অঘোষিত কৌশলগত নিরাপত্তাবলয় গড়ে ওঠে। এর লক্ষ্য ছিল বিপ্লবের প্রভাব থেকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোকে রক্ষা করা। সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হওয়ায় প্রচলিত নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। নতুন নিরাপত্তা উদ্যোগ হিসেবে সৌদি আরব ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। অন্যদিকে ন্যাটোভুক্ত দেশ তুরস্কও ইসরায়েলের অব্যাহত হুমকির মুখে ন্যাটোর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না। ফলে তারা নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যুক্ত হওয়ার তাগিদ অনুভব করছে। বলা যায়, পেট্রো-ডলারের আধিপত্য, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থন, গাজায় নৃশংসতা ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মতো বিষয়গুলো মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ আমূল বদলে দিয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার শক্তি কমিয়ে ফেললে সৃষ্ট শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে, সেই ভাবনা থেকেই মক্কা চুক্তির উদ্ভব। তবে মক্কা চুক্তি এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নয়; বরং এটি একটি 'আংশিক নিরাপত্তা কাঠামো'। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত ভূমিকার বিপরীতে নিজেদের সুসংহত করতেই এই মক্কা চুক্তি ত্বরান্বিত হয়েছে। মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল? এম হুমায়ুন কবির: বাংলাদেশে এই চুক্তির প্রতি আগ্রহের পেছনে মূলত দুটি দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করছে। প্রথমত, যেহেতু এটি 'মক্কা চুক্তি', তাই এর সঙ্গে একটি ধর্মীয় বিশ্লেষণ ও আবেগ যুক্ত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাদের যুক্তি হলো এমন একটি জোটের অংশ হওয়া মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংহতি বৃদ্ধি করবে এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে। দ্বিতীয়ত, অনেকের আলোচনায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। ভারত যেহেতু একটি বৃহৎ প্রতিবেশী এবং দেশটির সঙ্গে বর্তমানে একধরনের কূটনৈতিক অস্থিরতা বিদ্যমান, তাই অনেকের মনেই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ রয়েছে। এ ধরনের একটি প্রতিরক্ষা জোটে যোগদান করলে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বা শঙ্কা মোকাবিলা করা সহজ হবে বলে মনে করছেন অনেকে। প্রথমবারের মতো কোনো একটি প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ততার ব্যাপারে বাংলাদেশের ইতিবাচক মনোভাবকে কীভাবে দেখছেন? এম হুমায়ুন কবির: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে আমরা কখনোই কোনো সামরিক জোটে অংশগ্রহণ করিনি। এমনকি জাতিসংঘের সুস্পষ্ট অনুমোদন ব্যতিরেকে আমরা আন্তর্জাতিক কোনো সামরিক বা শান্তি রক্ষা মিশনেও অংশ নিইনি। নানা সময়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটলেও বাংলাদেশের এই নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তাই বর্তমানে এ ধরনের কোনো সামরিক জোটে যোগদানের সিদ্ধান্ত হবে আমাদের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কাঠামোর একটি আমূল পরিবর্তন। এমন বড় পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও সতর্কতা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, বর্তমান সরকারের ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতি হলো 'সবার আগে বাংলাদেশ'। এই নীতির মূল ভিত্তি হলো কোনো বিশেষ শক্তির দিকে ঝুঁকে না পড়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। যদি বাংলাদেশ এই নতুন সামরিক জোটে যোগ দেয়, তবে তা সরকারের এই নিরপেক্ষ অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। সুতরাং এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আমাদের দীর্ঘদিনের জাতীয় ঐকমত্য এবং বর্তমান সরকারের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে এর সামঞ্জস্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। এই জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুবিধা কী বলে মনে করেন? এম হুমায়ুন কবির: এই চুক্তির সম্ভাব্য লাভের দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করলে প্রথমেই আসে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়টি। এ ছাড়া সৌদি আরবের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের বিশাল শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে বাড়তি কিছু সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে লাভের পাশাপাশি ঝুঁকির দিকটিও অত্যন্ত প্রবল। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্য কয়েক দশক ধরেই একটি চরম সংঘাতময় অঞ্চল এবং বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই এর বাইরে থেকেছে। কিন্তু এই জোটে যুক্ততা সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অংশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। দ্বিতীয়ত, এই জোটটিকে যদি 'সুন্নি জোট' হিসেবে দেখা হয়, তবে অন্য ধারার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তৃতীয়ত, আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান পথ হলো লোহিত সাগরের 'বাব আল-মান্দেব' প্রণালি। এটা বর্তমানে ইয়েমেনের হুতিদের প্রভাবাধীন, যাদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘর্ষ চলমান। এই জোটে সরাসরি যোগ দিলে বাংলাদেশ হুতিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা বর্তমানে তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সফল সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছি। দ্বিপক্ষীয়ভাবে আমরা যেসব সুবিধা পাচ্ছি, সেগুলো এই চুক্তিতে যুক্ত না হয়েও বজায় রাখা সম্ভব এবং এতে কোনো ঝুঁকি নেই। তাই আমাদের এখন ভেবে দেখতে হবে, আমরা কি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমে ঝুঁকিমুক্ত থাকব, নাকি কোনো জোটে যোগ দিয়ে নতুন কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হব? এই চুক্তি এবং এতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ভারতের তরফে তীব্র প্রতিক্রিয়া টের পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের উদ্বেগকে বাংলাদেশ কীভাবে দেখবে? এম হুমায়ুন কবির: ভারতের আচরণ বা প্রতিক্রিয়া তাদের নিজস্ব বিষয়। আর আমাদের যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের নিরিখে। এই চুক্তির আলোচনা বর্তমানে কেবল নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হলেও জাতীয় স্বার্থের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। আমাদের অর্থনীতির সঙ্গে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নিবিড়ভাবে জড়িত; তাই এই ভারসাম্য রক্ষা করা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। চীন ও আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা বজায় রয়েছে। এর মধ্যে মক্কা চুক্তি কি আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা তৈরি করবে? এম হুমায়ুন কবির: বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে চীনের কূটনৈতিক অবস্থান বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ইরান সংকটের সময় আমরা দেখেছি যে চীন মূলত ইরানের পক্ষাবলম্বন করেছে। এ ছাড়া ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক সমঝোতা স্থাপনেও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মূলত, বাংলাদেশে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভাজন বা সংঘাত তৈরি হোক, তা চীনের ব্যবসায়িক স্বার্থের পরিপন্থী। ঠিক একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা কামনা করে। বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক কল্যাণের পাশাপাশি মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থও সুরক্ষিত হয়। সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পরাশক্তিই সম্ভবত বাংলাদেশের বর্তমান ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখাকেই সমর্থন করবে। যেকোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া কী হওয়া উচিত? এম হুমায়ুন কবির: এ ধরনের বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সংসদের বাইরে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের সঙ্গেও এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করা প্রয়োজন। এটি কেবল সরকারের একটি অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত নয়; বরং একটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব অংশীজনের মতামত নেওয়া জরুরি। আপনাকে ধন্যবাদ। এম হুমায়ুন কবির: আপনাকেও ধন্যবাদ।
মক্কা চুক্তিতে গেলে আমাদের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যস্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে
View on original source
Share
Archive
Like

(0)Comments

 

Related Opinion

A note on cookies

Newshunt uses essential cookies to keep you signed in and to remember your language and country, so the site works the way you expect. With your permission, we'd also like to use analytics cookies to understand how people use Newshunt and improve it over time.

Accepting only affects analytics. To learn more, view our Privacy Policy or Terms & Conditions.